আর যে কাজ হয়েছে তার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সরকারের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রকল্প দুটির অধীনে নির্মিত বক্স কালভার্টগুলো এতোই নিম্নমানের যে সেগুলো মেরামতে নতুন করে প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর কারণ হিসেবে, প্রকল্প পরিচালকের অনিয়ম, ঠিকাদারের অযোগ্যতা এবং বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে আইএমইডির এক প্রতিবেদনে।
আইএমইডি বলছে, ঢাকা অঞ্চলের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোণা জেলার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজের ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
প্রকল্পে তিন বছর মেয়াদে ৩৭৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ২১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং সময় লেগেছে ৫ বছর ৬ মাস। অর্থাৎ ব্যয় না বাড়লেও বাস্তবায়নকাল বেড়েছে।
নির্মিত ফ্লেক্সিবল পেভমেন্টের লেয়ার পরীক্ষা
নির্মিত ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট
আর রাজশাহী অঞ্চলের প্রকল্পের আওতায় সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ, রাজশাহী ও নবাবগঞ্জ জেলার প্রকল্পগুলোর ৮৫ শতাংশ কাজ হয়েছে সমাপ্ত ঘোষণার আগে।প্রকল্পে তিন বছর মেয়াদে ২২৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও খরচ হয়েছে ১৬৬ কোটি টাকা এবং সময় লেগেছে ৫ বছর ৬ মাস।
আইএমইডি মনে করছে, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো যে লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল তা যথাযথভাবে অর্জিত না হওয়ায় জনগণও বঞ্চিত হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার বলেন, কোনো প্রকল্প অনন্তকাল চলতে পারে না। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ঢাকা ও রাজশাহী জোনের সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সর্বশেষ বেঁধে দেওয়া মেয়াদেও কাজ শেষ করতে না পারায় সরকার অসমাপ্ত রেখেই সেগুলো সমাপ্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
“প্রকল্পগুলোর মধ্যে কয়েকটি পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন দিয়েছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু আইএমইডির বাস্তবায়নকারী সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবহিত করতে পারি।”
এ বিষয়ে প্রকল্পটি দুটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
অবশ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের যে চিত্র আইএমইডি দিয়েছে তাতে বিচলিত নন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক। তিনি বলেন, “যে কোনো প্রকল্প শেষ হলেই আইএমইডি একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু তাদের প্রতিদেবন বাইবেল নয়।
“তাদের প্রতিবেদনেও ভুল থাকে। কারণ তাদের পরিদর্শন দলে ইঞ্জিনিয়ার নেই। তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে অডিট করালেই সত্য প্রতিবেদন পাওয়া যাবে।”
নির্মিত ফ্লেক্সিবল পেভমেন্টের লেয়ার পরীক্ষা
নির্মিত ও অসমাপ্ত সড়ক
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঢাকা ও রাজশাহীর এই ৬৯টি সড়ক উন্নয়নে ৩ বছর মেয়াদী দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় ২০০৯ সালে। মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় আরও আড়াই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৪ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষমাত্রা দেয় সরকার।এর মধ্যে ঢাকা অঞ্চলের ১২ জেলার ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রাজশাহী জোনের ছয় জেলার ২৯টি সড়ক উন্নয়নে উপ-প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সম্মিলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।প্রকল্প শেষ ঘোষণার পর পরিদর্শনে যায় আইমএইডি। এরপর সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ে এই প্রতিবেদন দেয় তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদার নিয়োগে প্রকল্প পরিচালক অনিয়মের আশ্রয় নিতে গিয়ে বারবার দরপত্র বাতিল আর পুনঃদরপত্র আহ্বান করে ব্যাপক সময়ক্ষেপণ করেন।
“অত্যধিক নিম্ন কিম্বা উচ্চদরের কারণে বারবার দরপত্র বাতিলপূর্বক পুনঃদরপত্র আহ্বানে সময় ক্ষেপণ করে। কয়েকটি প্যাকেজে ঠিকাদারের অযোগ্যতার কারণে কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। সব মিলে ঢাকা জোনের প্রায় ৪০ ভাগ আর রাজশাহী জোনের ১৫ ভাগ কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে।”
এছাড়া অর্থ বরাদ্দের স্বল্পতা, ভূমির অতিরিক্ত মূল্য ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেও প্রকল্পটি সমস্যায় পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নির্মিত ও অসমাপ্ত সড়ক
ক্ষতিগ্রস্থ সড়ক বাঁধ
এতে বলা হয়েছে, “প্রকল্প দুটির যেসব অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে সেসব সড়কেও খাড়া ঢাল ও রেইন কাট সৃষ্টি হয়েছে। নির্মিত পেভমেন্টের অনেক স্থানে কিনারা ভাঙ্গা, পটহোল সৃষ্টি, সার্ফেস ক্ষয় ও ক্রোকোডাইল ক্র্যাক সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলে নির্মিত সড়কগুলোর মান রক্ষা করা হয়নি।”আইএমইডি প্রতিবেদনে প্রকল্প দুটির এসব অনিয়ম তদন্ত করতে ‘এক্সটার্নাল অডিটের’ প্রস্তাব করা হয়েছে। তার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা অঞ্চলের প্রকল্পে পাঁচজন পরিচালক আর রাজশাহী জোনের জন্য আটজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প দুটি এ দশায় পড়ার জন্য ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদলিও দায়ী; যাদের মেয়াদ এক বছরের কম। ভবিষ্যতে এভাবে ঘন ঘন পরিচালক বদলি না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/30-01-2016/মইনুল হোসেন