মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডেস্কঃ আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে শুক্রবার দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সংবাদ সম্মেলন।
ব্যবসায়ীদের ওপর অন্যায়ভাবে কর চাপানো হলে তা আদায় করা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ।
অবশ্য তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণে তাদের ‘সময় লাগবে’। সব চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের মত জেনে সাত দিন পর এফবিসিসিআই লিখিত প্রতিক্রিয়া জানাবে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের জন্য তিন লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করার পরদিন তার প্রতিক্রিয়া জানাতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন এফবিসিসিআই সভাপতি।

এফবিসিসিআইর সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে মাতলুব আহমাদ বলেন, “এখন পর্যন্ত বাজেটের অনেকগুলো জায়গা ভালো আছে। অনেকগুলোতে খারাপ আছে। তাই মোটা দাগে খারাপ বা ভালো বলতে পারছি না।
“তবে সাত দিন পর পুরো বিশ্লেষণ করে আপনাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেব ভালোর অংক বেশি, না খারাপের অংক বেশি। তখনই বলব, মোটা দাগে ভালো, না খারাপ।”
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, “আমরা লক্ষ্য করেছি, বাজেটের আকার অনেক বড় হয়েছে। বাজেটের আকার বড় মানেই রেভিনিউয়ের (রাজস্ব) আকার বড় হবে। রেভিনিউয়ের আকার বড় হওয়া মানেই ব্যবসায়ীদের আরও টাকা দিতে হবে। আমরা টাকা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু আমরা আমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকতে চাই।”
হয়রানির জন্য অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে বলে এসময় অভিযোগ করেন তিনি।
বাজেট বিশ্লেষণ করার জন্য এফবিসিসিআইর টিম ‘আপ্রাণ’ চেষ্টা করছে জানিয়ে সংগঠনটির সভাপতি বলেন, “বাজেটে আমরা যে সাতটি পয়েন্ট চেয়েছিলাম, সেই সাতটি পয়েন্টের প্রতিফলন এখনও খুঁজে পাইনি। বরঞ্চ সরকার যেভাবে আরও ট্যাক্স আদায় করা যায় এবং ছোট ছোট ব্যবসায়ীর উপরে যে ট্যাক্স তারা আদায় করার নতুন ফর্মুলা দিয়েছে, তা খুঁজে খুঁজে বের করতে হচ্ছে, উনারা কীভাবে এটি অর্জন করতে চান?”
আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, “ফেডারেশন মনে করে, যে কোনো ভ্যাট বা ট্যাক্স অন্যায়ভাবে যদি ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সেগুলো আদায় করা কঠিন হবে।”
আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াতে সময় লাগার কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “সাত দিন সময় নিচ্ছি। দুটো কারণ। একটি হচ্ছে আমাদের নেতৃত্বকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলে যেতে হচ্ছে সৌদি আরবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে বাজেটটি বিশাল। এর ভেতরে-ভেতরে অনেক কিছু আছে, যা খুঁজে খুঁজে বের করতে হচ্ছে।
“এর কোনটা ব্যবসায়ীদের স্বার্থে আর কোনটা ব্যবসায়ীদের স্বার্থে না- তা খুঁজে বের করার জন্য সময় লাগছে। প্রত্যেকটি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিক্রিয়াও প্রয়োজন। সেজন্য আমি বলতে চাই, আমরা আগামী ৮ বা ৯ তারিখে সম্পূর্ণভাবে এই বাজেট বিশ্লেষণ … তুলে ধরতে পারব।”
এফবিসিসিআইর ৪৮০টি অ্যাসোসিয়েশন, ৮০টি চেম্বার ও রয়েল চেম্বার রয়েছে- জানিয়ে মাতলুব আহমাদ বলেন, “অনেক অ্যাসোসিয়েশন কিন্তু বাজেটকে প্রশংসা করতে পারছে না। তাদের প্রতিক্রিয়া আমাদের কাছে পাঠাতে চাচ্ছে। তারা বলতে চাচ্ছেন, এফবিসিসিআইর প্ল্যাটফর্ম আমাদের সবার।
“সবার কথা যাতে ফোডারেশন তুলে ধরে, সেটিই হবে ফেডারেশনের কাজ। সেজন্য যেহেতু আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, আমরা সবাই আছি, সবাই চেষ্টা করছি আমাদের ব্যবসায়ীদের মনের কথা আপনাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে তুলে ধরার জন্য।”
এফবিসিসিআই চার মাস খেটে যে প্রস্তাবগুলো সরকারকে দেয় তার কতটুকু সরকার নিয়েছে, কতটুকু নেননি- তাও ধরা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “তাহলে আগমীবার বাজেট বৈঠক আমরা করব, কি করব না সেটিও আমাদের চিন্তা করতে হবে।
“আমরা বলে যাব, উনারা শুনবেন কিন্তু বাজেটে প্রতিফলন দেখব না তাহলে আমাদের সেই মিটিংয়ের কোনো প্রয়োজন নাই।”
প্রশ্নোত্তর পর্ব
সংবাদ সম্মেলনে এক ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসায়ী ১৪ হাজার টাকা প্যাকেজ ভ্যাট বহালের দাবি জানিয়ে বলেন, “আমরা প্রতিবছর ১৪ হাজার টাকা প্যাকেজ ভ্যাট দিতাম। ১৪ হাজার টাকার জায়গায় ২৮ হাজার টাকা দিলে আমরা পারব না।”
জবাবে এফবিসিসিআই সভাপতি মাতলুব বলেন, সরকার যখন বাজেট পেশ করে বাজেট তখনই পাস হয় না।
“এটি উপস্থাপন করা হয় আমাদের প্রতিক্রিয়া নেওয়ার জন্য। আপনাদের নিয়ে এনবিআর ও মন্ত্রীর সঙ্গে বসব। আপনাদের মনের কথা বলবেন এবং আপনারাই তাদের বোঝাতে পারবেন যে, কেন ১৪ হাজার হবে; কেন ২৮ হাজার হবে না।”
প্রস্তাবিত বাজেট শিল্প বান্ধব কীভাবে- এমন প্রশ্নে মাতলুব আহমাদ বলেন, “গতকাল যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছি, সে বাজেট সম্পূর্ণ তখনও শুনতে পারি নাই। আমরা বলেই ছিলাম, আংশিক বাজেটের উপরে আমাদের প্রতিক্রিয়া।”
মনে রাখতে হবে দেশ আমাদের, সরকার আমাদের, ব্যবসা আমাদের- একথা উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, “আমরা চাই সরকার এমনভাবে বাজেট দেবেন যাতে আমরা সুন্দরভাবে আমাদের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমরা সাত দিন পর আমাদের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ দেব।”
রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে পোশাক খাতে উৎসে কর ধরা হয় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছর তা বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হলেও ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে তা শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ করা হয়। এবার বাজেটে তা বাড়িয়ে ১.৫০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। আর কর্পোরেট কর ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়েছে।
পোশাক খাতে উৎসে কর বাড়ালে এবং করপোরেট কর কমালে কোনো সুবিধা মিলবে কি না- এমন প্রশ্নে এফবিসিসিআইয়ের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) বলেন, উৎসে করটা মুনাফার ওপরে নয়, এটি হল বিক্রয়ের ওপরে। যত রপ্তানি হবে তার ওপরে এক দশমিক ৫ শতাংশ … ।
“আরেকদিকে বলা হচ্ছে, ৩৫ পারসেন্ট করপোরেট ট্যাক্সকে ২০ পারসেন্ট করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আপনি যদি গড়ে তিন পারসেন্ট প্রফিট করেন সেখানে আপনাকে দিতে হবে ৫০ পারসেন্ট করপোরেট ট্যাক্স। যেটি অস্বাভাবিক ও অসম্ভব।”
এফবিসিসিআই মনে করে মুনাফার ওপর ট্যাক্স হওয়া উচিত- একথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আর না হলে রপ্তানির হার বৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়বে, বিনিয়োগ বন্ধ হবে। মানুষের আস্থা কমে যাবে।
“… আমরা যে মধ্য আয়ের দেশ ও শিল্প উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছি, এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে আজ শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান ছাড়া অন্য কোনো পথ আছে বলে আমরা মনে করি না।”
সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই কোনো দিন কালো টাকাকে ‘স্পন্সর’ করে না উল্লেখ করে মাতলুব আহমাদ বলেন, “আমরা কালো টাকার বিরুদ্ধে সবসময় থাকব এবং আছি “