মূল সংবাদে যান
০৮ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ার করুন

খাদ্যবর্জ্যের কম্পোস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক, দূষিত হতে পারে কৃষিজমি

ডেস্ক রিপোর্ট ১১০ বার পঠিত ৫ মিনিটের পাঠ
খাদ্যবর্জ্যের কম্পোস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক, দূষিত হতে পারে কৃষিজমি

খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগে প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যবর্জ্য থেকে তৈরি কম্পোস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে যেতে পারে, যা পরে কৃষিজমির মাটিতে মিশে দূষণ বাড়াতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় খাদ্য অপচয় কমানো গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ ধরনের উদ্যোগে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকিও শুরু থেকেই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রতিবছর অপচয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যবর্জ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ ভাগাড়ে যায়। এতে বছরে প্রায় ৩ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমতুল্য গ্যাস তৈরি হয়।

জার্নাল নেচার ফুডে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতির ওপর জলবায়ু, পুষ্টিদূষণ ও প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব তুলনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভারমন্টের গবেষকেরা জীবনচক্র বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে এই গবেষণা করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যবর্জ্য ভাগাড়ে না পাঠিয়ে পুনর্ব্যবহার বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনা করা হলে এর জলবায়ুগত প্রভাব ৮৯ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে পানিতে অতিরিক্ত পুষ্টি জমে শৈবালের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির মতো পরিবেশগত সমস্যাও কমতে পারে।

তবে এর বিপরীত একটি ঝুঁকিও রয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, কম্পোস্টে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিজমিতে বছরে প্রায় ২০ হাজার টন প্লাস্টিক দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষণাটির প্রধান লেখক কেট পোর্টারফিল্ড বলেন, ‘কোনো পণ্য বা প্রক্রিয়ার কার্বন ফুটপ্রিন্ট হিসাব করার মতো করেই খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, তা হিসাব করা হয়েছে।’

তার মতে, বিপুল পরিমাণ খাদ্য প্লাস্টিকের প্যাকেটসহ নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় খাদ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। খাদ্যবর্জ্য পুনর্ব্যবহারের একটি পদ্ধতিতে যান্ত্রিক ‘ডিপ্যাকার’ ব্যবহার করে খাবার ও প্যাকেট আলাদা করা হয়। এরপর প্যাকেট ভাগাড়ে পাঠানো হয় এবং খাদ্যবর্জ্য কম্পোস্ট বা অ্যানারোবিক ডাইজেশনের মতো কাজে ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু গবেষকেরা দেখেছেন, প্লাস্টিক আলাদা করার প্রযুক্তি ৯৯ শতাংশ কার্যকর হলেও ভাগাড় থেকে খাদ্যবর্জ্য সরিয়ে নেওয়ার ফলে মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ প্রায় ১০ গুণ বাড়তে পারে।

পোর্টারফিল্ড বলেন, ‘যখনই খাদ্যবর্জ্য অন্যভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য ভাগাড় থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তখন মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকি থাকে।’ কারণ মানুষ বা যন্ত্র, কোনোটিই শতভাগ নিখুঁতভাবে প্লাস্টিক আলাদা করতে পারে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রায় সব ধরনের খাবারই এখন কোনো না কোনোভাবে প্লাস্টিকের প্যাকেটে বাজারজাত হওয়ার বাস্তবতা।

গবেষণার সহলেখক এরিক রয় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ভারমন্টে খাদ্যবর্জ্য ভাগাড়ে না পাঠানোর বিষয়ে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী নীতিগুলোর একটি রয়েছে। ২০২০ সাল থেকে সেখানে ইউনিভার্সাল রিসাইক্লিং আইন পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে। এই আইনে সব পরিবারের খাদ্যবর্জ্য ভাগাড়ে পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, ভারমন্টের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে দেশজুড়ে এ ধরনের নীতি গ্রহণের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা সম্ভব। তবে শুরু থেকেই এসব নীতি প্রণয়নের সময় প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

খাদ্যের অপচয় কমাতে গিয়ে প্লাস্টিক ব্যবহারের প্রশ্নটিও জটিল। খাদ্যবর্জ্য নিয়ে কাজ করা সামাজিক উদ্যোগ সাসেক্স সারপ্লাসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ফিল হলটাম বলেন, ‘প্লাস্টিক প্যাকেজিং সব সময় অপ্রয়োজনীয়, এমন ধারণা ঠিক নয়। বিশেষ করে ছোট কৃষকের উৎপাদিত তাজা পণ্যের মেয়াদ বাড়াতে অনেক ক্ষেত্রে প্যাকেজিং প্রয়োজনীয়।’

তার ভাষায়, ‘পরিবেশকর্মী হিসেবে আমরা খাদ্যের অপচয় কমাতে চাই। একইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহারও বন্ধ করতে চাই। এখানেই মূল দ্বন্দ্ব।’

শেফ, লেখক ও পরিবেশকর্মী ম্যাক্স লা মান্না বলেন, ‘দেখতে একেবারে নিখুঁত নয়, এমন ফল ও সবজিও খাদ্য অপচয়ের একটি কারণ। বাঁকা, আকারে একটু ভিন্ন বা সামান্য দাগযুক্ত পণ্য বাজারে নিতে অনেক সুপারমার্কেট অনাগ্রহী থাকে, কারণ তারা মনে করে ক্রেতারা দেখতে নিখুঁত পণ্যই চান।’

‘আমরা নিখুঁতকে ভালো জিনিসের শত্রু হতে দিচ্ছি,’ বলেন তিনি।

এরিক রয় বলেন, ‘স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানেও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ায় অতিরিক্ত প্যাকেটজাত খাবার থেকে সরে আসার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম বাধা তৈরি করতে পারে।’

গবেষক কেট পোর্টারফিল্ডের মতে, খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াটি এমন সহজ করা দরকার, যাতে মানুষকে আলাদা করে বর্জ্য বাছাই করার বিষয়ে খুব বেশি ভাবতে না হয় এবং ভুলের সুযোগ কমে।

এরিক রয় ‘উইশ রিসাইক্লিং’-এর কথাও বলেন। অর্থাৎ কোনো জিনিস পুনর্ব্যবহারযোগ্য না হলেও তা রিসাইক্লিংয়ের বিনে ফেলে মানুষ আশা করেন, সেটি হয়তো পুনর্ব্যবহার করা যাবে।

তার পরামর্শ, সামগ্রিকভাবে বর্জ্য কমাতে পুরোনো পরিবেশবান্ধব অভ্যাসগুলোতে ফিরে যেতে হবে। যেমন সম্ভব হলে বেশি পরিমাণে কিনে প্লাস্টিকের প্যাকেজিং কমানো, বর্জ্য আলাদা করার ক্ষেত্রে যত্নবান হওয়া এবং কোনো বস্তু পুনর্ব্যবহারযোগ্য কি না নিশ্চিত না হলে সেটি সাধারণ বর্জ্যের বিনে ফেলা।