স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নতুন বিধিমালার খসড়ায় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও পোস্টার নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। তবে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন এবং সীমিত সংখ্যায় বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ব্যয় নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে দেখানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে বিধান রাখা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ—এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আলাদা আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সোমবার বলেন, “স্থানীয় সরকারের ৫ স্তরের নির্বাচনের আচরণবিধি ইসির অনুমোদন হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং হলে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।”
গত জুনে এসব আচরণবিধির খসড়া ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে মতামত চাওয়া হয়েছিল। পরে পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করে খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ইসির ওয়েবসাইটেও ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের ২০২৬ সালের আচরণবিধির খসড়া প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
সচিব জানান, প্রকাশিত খসড়ার মূল কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শব্দগত পরিমার্জন ও সংযোজন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় করে পোস্টার বাদ দেওয়া হয়েছে; প্রচারের অন্যান্য বিষয় রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটের প্রচারের সুযোগ থাকলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বা অপব্যবহারমূলক প্রচারণা ঠেকাতে বিধান রাখা হয়েছে। এসব মাধ্যমে প্রচারের ব্যয়ও প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের মধ্যে দেখাতে হবে।
কী আছে আচরণবিধিতে
পোস্টার ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যানার, লিফলেট ও ফেস্টুনের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২০টি এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ আকার ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট। ব্যানারের আকার সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল এ-ফোর আকারের এবং ফেস্টুনের আকার ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রচারসামগ্রী সাদাকালো রাখার বিধানও রয়েছে। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে মুদ্রণের তারিখ না থাকা, পলিথিনের আবরণ ও পিভিসি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারসামগ্রীতে প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আকারের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হতে পারবে না। প্রচারে জীবন্ত প্রাণী ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নতুন আচরণবিধিতে মাইক ব্যবহারের সময়সীমা কমানো হয়েছে। বেলা ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো যাবে। একাধিক মাইক্রোফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
একই সময়সীমায় ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনেও প্রচার চালানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
কারা প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না
আচরণবিধিতে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা সংশ্লিষ্ট পরিষদের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
ভোটের সময় নির্বাচন পরিচালনার কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সার্কিট হাউস, রেস্ট হাউস ও ডাকবাংলো ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও পাঁচ আচরণবিধিতে যুক্ত করা হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে জরিমানা
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। নতুন বিধিমালায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। আচরণবিধির খসড়া নিয়ে আলোচনার সময় নির্বাচন কমিশন এ ধরনের বিধান রাখার কথা জানিয়েছিল।
ইউনিয়ন পরিষদের ভোটে যা নতুন
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য ২০১৬ সালের আচরণবিধির পরিবর্তে নতুন বিধিমালা করা হচ্ছে।
নতুন বিধিতে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ব্যয়ও নির্বাচনী ব্যয়ের সীমার মধ্যে গণনা হবে।
মাইক ব্যবহারের সময়সীমা ছয় ঘণ্টা রাখা হলেও তা বেলা ১২টা থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। একটির বেশি মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না।
প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতার বিধানও নতুন আচরণবিধিতে যুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলায় নির্বাচনী ক্যাম্প ও বিলবোর্ড
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ আকার ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট রাখা হয়েছে। পুরো উপজেলায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন এলাকায় একটি এবং পৌরসভার প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
নির্বাচনী ক্যাম্পের সংখ্যাও সীমিত করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি, প্রতি ইউনিয়নে একটি এবং পৌরসভা এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডে একটি করে ক্যাম্প স্থাপন করা যাবে।
আগের ব্যবস্থায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি নির্বাচনী ক্যাম্প করার সুযোগ ছিল।
পৌরসভায় বিলবোর্ড ও ক্যারাভান
পৌরসভা নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
এ ছাড়া বেলা ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক এবং ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনে প্রচার চালানো যাবে।
জেলা পরিষদে মাইক বন্ধ
জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
সিটি করপোরেশনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ একটি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
মেয়র প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প আগের মতো প্রতি থানায় একটি করে রাখার সুযোগ রয়েছে।
দলীয় প্রতীক থেকে নির্দলীয় নির্বাচন
২০১৫ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে ভোটের ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।
২০২৫ সালের অগাস্টে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিধান বাতিল করা হয়। ফলে আগামীতে এসব নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে হওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
আগের ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভায় মেয়র এবং সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ ছিল। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পদে নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হয়েছে।
নতুন আচরণবিধি তৈরির উদ্যোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এর আগে বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো পোস্টার থাকবে না।
তিনি বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধিমালা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন-বিধির সঙ্গে সমন্বয় করে সংস্কার করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় সরকারের পৃথক নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর সংশোধন আরও পর্যালোচনা করে পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আচরণবিধির খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।