মালয়েশিয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু, বিনা খরচে যেতে পারবেন ১০ হাজার কর্মী
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া দেশটির শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে দেশের ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি। প্রসেসিং এজেন্সি হিসেবে কাজ করবে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলসহ ২৫টি বেসরকারি এজেন্সি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কাজ করছেন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। তাই বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা এবং স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আগে কী ব্যবস্থা ছিল ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন ও তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে। দেশটি যেসব উৎস থেকে কর্মী নিয়োগ করে, সেসব দেশের ক্ষেত্রেও নিজস্ব নীতিমালা ও যোগ্যতার শর্ত অনুসরণ করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আলোচনার একপর্যায়ে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু শর্তে নমনীয়তা দেখায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। পরে প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ও সহায়ক দলিলসহ ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
শ্রমবাজার চালু করতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ ও সীমিত হয়ে যাওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজার পুনরায় চালু এবং সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে মালয়েশিয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেন। সফরে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেন।
১০ হাজার কর্মী নেওয়া হবে বিনা খরচে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এটিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য শুধু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা নয়; বরং সর্বোচ্চসংখ্যক বৈধ ও যোগ্য বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের স্বার্থ ও অভিবাসন ব্যয় সুরক্ষিত রাখা।
তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং ২৫টি বেসরকারি এজেন্সিকে প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর পাশাপাশি আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা খুঁজে বের করতে পারবে এবং চাহিদাপত্র সংগ্রহ করতে পারবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। এসব কার্যক্রম বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসারে সম্পন্ন করতে হবে।
যেভাবে চলবে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় প্রথমে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়া থেকে নিজেদের উদ্যোগে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট এজেন্সি কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কলিং ভিসা, ই-ভিসা বা অন্যান্য নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বোয়েসেলসহ তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ছাড়পত্র নেবে। যে এজেন্সির নামে চাহিদাপত্র আসবে, সেই এজেন্সির নামেই ছাড়পত্র করা যাবে। এ ক্ষেত্রে বোয়েসেলসহ তালিকাভুক্ত প্রসেসিং এজেন্সিগুলো প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র দিতে পারবে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অনুমোদিত কেন্দ্র মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারগুলো পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছে। মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে কেন্দ্রগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করার পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।
তবে বর্তমানে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত মেডিকেল সেন্টারগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব কেন্দ্র বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় থাকবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন মেডিকেল সেন্টার যুক্ত করা হলে তা সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মীরা তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন এবং অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারবেন। কোনো নির্দিষ্ট মেডিকেল সেন্টারকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না।
সরকারের লক্ষ্য, সর্বোচ্চসংখ্যক বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, কর্মীদের স্বার্থ ও অভিবাসন ব্যয় সুরক্ষিত রাখা এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, সুশৃঙ্খল ও টেকসই শ্রমবাজার গড়ে তোলা।