মূল সংবাদে যান
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেয়ার করুন

ঢাবি উপাচার্যের বাসায় হামলার ঘটনায় সংসদে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ১৫৬ বার পঠিত ৬ মিনিটের পাঠ

ডেস্ক রিপোর্ট ।। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের বাসায় রোববার গভীর রাতে হামলায় সংসদে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানানো হয়েছে। সোমবার জাতীয় সংসদের অনির্ধারিত আলোচনায় এই নিন্দা জানানো হয়।

আলোচনায় সংসদ সদস্যরা বলেন, যারা মুখোশ পরে এই ধরনের আক্রমণ করেছে তারা কাপুরুষ। মৃত্যুর মিথ্যা স্টেটাস যারা দিয়েছেন তারা তো জামায়াত-শিবিরের এজেন্ট।

প্রথমেই আলোচনার সূত্রপাত করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী। একপর্যায়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় কঠিন আন্দোলন করেছি। তখন চ্যান্সেলর ছিলেন মোনায়েম খান। তিনি কিন্তু শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেননি। কিন্তু এখন প্রশ্ন আন্দোলন-সংগ্রাম তো আমরা করেছি। কিন্তু মুখোশ পরতে হবে কেন। কেন গভীর রাতে আন্দোলনের নামে ভিসির বাড়ির ঘর ভাঙচুর করতে হবে। কেন মেয়েদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে হবে। সাহস থাকলে মুখটা দেখা, লজ্জা করে না। ইতর হওয়ার একটা সীমা আছে।’

গণজাগরণমঞ্চের আহ্ববায়ক ড. ইমরান এইচ চৌধুরীর নাম উল্লেখ না করে মতিয়া বলেন, ‘ফেসবুক ব্যবহার করে যে মারা যায়নি তাকে মেরে ফেলবেন। আমি আবারও বলতে চাই, মুখোশ পড়ে হামলা কেন?, কাপুরুষ, মুখ দেখানোর সাহস থাকে না। আবার তারা আসে কোটা আদায়ের জন্য উপাচার্যের বাড়ি ভাঙচুর করতে। পারলে সামনে আয়, দেখি কত শক্তি।’

তিনি বলেন, আসল সমস্যা মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। পৃথিবীর দেশে দেশে মুক্তিযুদ্ধে, দেশের সার্ভবৌমত্বের কারণে যারা জীবন বাজি রাখে তাদের জন্য সুযোগ আছে, সুযোগ দেয়া হয়। যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে তাদের সন্তানরা সুযোগ পাবে না, তাদের বাদ রেখে রাজাকারের বাচ্চাদের সুযোগ দিতে হবে? তারা যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সে জন্য রাজধানীকেন্দ্রিক একটি এলিট শ্রেণি তৈরি করার একটা সুপরিকল্পিত চক্রান্ত, তারই মহড়া কাল রাতে দেখলাম। পরিষ্কার বলতে চাই মুক্তিযুদ্ধ করেছি, এই রাজাকারের বাচ্চাদের আমরা দেখে নেব। আর ছাত্রদের প্রতি আমাদের কোনো রাগ নেই। কিন্তু স্টেটাস যারা দিয়েছে, তারা তো ছাত্র না, তারা তো জামায়াত শিবিরের এজেন্ট। এদের প্রতি সামান্যতম শৈথিল্য দেশবাসী আর দেখতে চায় না। হয় ওরা থাকবে নয় আমরা থাকব। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলব এদের প্রতি কোনো শৈথিল্য নয়, উপযুক্ত ব্যবস্থা নিন, যুদ্ধ ঘোষণা করুন, হয় এরা থাকবে নয় আমরা থাকব, এই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।’

তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, আমরা ছোটবেলায় আদর্শলিপিতে পড়েছিলাম শিক্ষককে মান্য করিবে, সদা সত্য কথা বলিবে। লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। এখন কেন যে মনে হচ্ছে আদর্শলিপির এই সুবচনগুলো এখন অনেকটায় নির্বাসনে গেছে।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য বিটিভিতে সাক্ষাৎকার দিতে দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, আমি তো শিক্ষক। আমার মানবতার একটা স্তর আছে। আমি যখন নিচে দেখলাম অনেকগুলো ছেলে মুখোশপড়া। তাদের বললাম তোমরা দাঁড়াও আমি আসছি। তার যে উদারতার সেই উদারতা তারা ধারণ করতে পারেনি। তারা দুতলায় গিয়ে সমস্ত বাড়ি তছনছ করল। সেই দৃশ্যগুলো আমি নিজে ভিডিও ফুটেছে দেখেছি।’

তারানা হালিম বলেন, দাবি সকলের থাকতে পারে। দাবি যৌক্তিক। দাবি আদায় সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু সেটার জন্য রাতের আঁধারে উপাচার্যের মতো শিক্ষক তার বাড়িতে ঢোকা , তার আলমামি ভাঙচুর, সবকিছু এলোমেলো করে দেয়া, জাতির জনকের প্রতিকৃতি ভাঙা এটাকে কোনোভাবেই আমরা দাবি আদায়ের পথ বলতে পারি না। দাবি আদায়ের পথ এটা হতে পারে না। আন্দোলন বহু দেখেছি। কিন্তু কোনো দিন এই ধরনের নৈরাজ্যজনক আন্দোলন দেখি নাই। এই আন্দোলন দেখে আমরা লজ্জিত, কারণ একদিন আমরা শিক্ষার্থী ছিলাম। কারণ তারা ঘরে ঢোকে স্ত্রী-সন্তানদের খোঁজ করেছে। আর স্ত্রী-সন্তান বাড়ির কোণে বাগানে লুকিয়ে ছিল।’

তিনি গণজাগরণমঞ্চের আহ্ববায়ক ড. ইমরান এইচ সরকারের নাম না নিয়ে বলেন, হঠাৎ করে একজনের পোস্ট দেয়া হলো। তিনি লিখেছেন আন্দোলনরত আহত একজন মারা গেছেন। পরে সেই কথিত ব্যক্তি এ বি সিদ্দিক নিজেই স্টেটাস দিলেন তিনি মারা যাননি।

আলোচনার সূত্রপাত করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, কোটাব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে যে আন্দোলন হচ্ছে তা আমাদের নাড়া দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা রেখেছিলেন। এখন কোটা বাড়তে বাড়তে ৫৬ শতাংশ হয়েছে। এটার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আমাদের ছেলেমেয়েদের মৌলিক অধিকার আছে দাবি জানানোর। কিস্তু তারা এটা করতে গিয়ে যে ভুল বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অপশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির বাসায় যে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। তা স্মরণকালে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনদিন ঘটে নাই। ভিসির বাসায় একতলা দুইতলা সব কিছু ভেঙে টুকরা টুকরা করে দেয়া হয়েছে। তাদের জীবনটা কোনোভাবে বেঁচে আছে। আমার ছোট ভাইয়ার বাসা সেটা। আমরা সারারাত জেগে ছিলাম। তারা আমাকে বলেছে দোয়া করবেন আমরা যেন বেঁচে থাকি।

তিনি বলেন, তারা দাবি করবে তাদের অধিকারের দাবি। সেখানে সংঘাত কেন? নৈরাজ্য কেন? বাসায় আক্রমণ কেন? এসব তো কাম্য নয়। এটি অনিভিপ্রেত। এই ধ্বংসাত্মক কার্যাকলাপের তীব্র নিন্দা জানাই। তাদের কোটাব্যবস্থার সংস্থার আমি নীতিগতভাবে সমর্থন করি। এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটি গঠন করারও দাবি জানাই।

এরপর ঢাকা-১৭ এর এমপি আবুল কালাম আজাদ বলেন, কোটা নিয়ে যে আন্দোলন এখন আর আন্দোলনের মধ্যে নেই এটি বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশেষ করে আমাদের পুলিশ বাহিনী এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছে। এটি সঠিক হয়নি। এই বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র সতর্কভাবে মোকাবেলা করতে হবে। তিনিও এ ব্যাপারে সংসদীয় কমিটি গঠন করে সমস্যা সমাধানের পক্ষে মত দেন।

প্রসঙ্গত, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা রোববার মধ্যরাতে উপাচার্যের বাসভবনে তাণ্ডব চালান। তাদের মধ্যে অনেকেই মুখোশ পরা ছিল।