কালাজ্বর মুক্ত বাংলাদেশ : স্বপ্ন ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে ঠিক কিন্তু জনস্বাস্থ্যের কিছু জটিল সমস্যাকেও এখনো আমরা সঙ্গী করে পথ চলছি। সম্প্রতি চিকনগুনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলেও কালাজ্বর বাংলাদেশে শতাব্দীরও পুরোনো একটি রোগ। চিকনগুনিয়ার রোগের বাহক এডিস মশা হলেও কালাজ্বর রোগের বাহক বেলেমাছি। বেলেমাছির কামড়ের মাধ্যমে এই রোগ সংক্রমিত হয়। পূর্বে এর প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের ২৬টি জেলার ১০০টি উপজেলা কালাজ্বরপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত আছে। বিশ্বে ম্যালেরিয়ার পরেই কালাজ্বর ২য় পরজীবিঘটিত প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে বিবেচিত। সরকারের পক্ষ থেকে এ রোগ নির্মূলের লক্ষ্যে জাতীয় কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচী ২০০৮ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এ কর্মসূচিতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে আইসিডিডিআর,বি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর সহায়তায় ও সরকারের উদ্যোগে কালাজ্বর রোগ সনাক্তকরণ ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ ও অন্যান্য উপকরণ সংশ্লিষ্ট এলাকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে দেয়া হচ্ছে। ফলে কালাজ্বর আক্রান্ত রোগীরা বিনামূল্যে এ সেবা পাচ্ছেন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমেই কালাজ্বর নির্মূল করা সম্ভব নয়, বেলেমাছির বংশবিস্তার রোধ এবং প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের মাধ্যমেই কেবল এ রোগের নির্মূল করা সম্ভব। আর এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিক সচেতনতা ও উদ্যোগের বিকল্প নেই। জনস্বাস্থ্যের ভাষায় এই রোগটিকে অবহেলিত রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাছাড়া কালাজ্বর রোগের সাথে দারিদ্রতার একটা গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ভেজা, স্যাতস্যাতে, নোংরা পরিবেশ এ রোগের ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে।
বেলেমাছির একটি কামড় একজন মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে দিতে পারে, শুধু তাই নয়, প্রাণহানীও ঘটাতে পারে। সেজন্য কালাজ্বর সম্পর্কে জানার কোন বিকল্প নেই। গবেষকদের মতে, দুই সপ্তাহের বেশি জ্বর, সম্ভবত কালাজ্বরের লক্ষণ। এখনও নির্মূলের ক্ষেত্রে যে বাঁধাটি বড় সেটি হলো রোগাক্রান্তদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে অনীহা। এক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারী-বেসরকারী স্বাস্থ্যকর্মীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরের বিজ্ঞানীদের সুদীর্ঘ কার্যকর গবেষণা উদ্ভাবনীর ফলে এখন বাংলাদেশেই কালাজ্বরের সকল ধরণের উন্নত চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে দ্রুত সঠিক চিকিৎসায় অন্তর্ভূক্তি রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে শুধুমাত্র একক মাত্রার এ্যাম্বিজম (লাইপোসোমাল এ্যাম্ফোটেরিসিন বি) ইনজেকশনের মাধ্যমে ১দিনের চিকিৎসাতেই প্রাণঘাতী এ রোগের হাত রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
তাই, কালাজ্বরের কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশ মুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার পাশাপাশি প্রয়োজন সকলের সচেতনতা। সেই সাথে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কালাজ্বর সংক্রান্ত তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের আন্তরিক অংশগ্রহণ ও পৃষ্ঠপোষকতাও জরুরি।
অবশেষে সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ কালাজ্বর মুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাড়াবে, সেই সোনালী স্বপ্নের বাস্তবায়ন চাই।
লেখকঃ সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্যকর্মী, ঢাকা।