যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন।
বুধবার (২ এপ্রিল) স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে প্রায় ১০০টি দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি এবং দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ বিবেচনায় এনে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে,তাই শুল্ক কমাতে হলে বাংলাদেশের আমদানি বাড়াতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করছেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে এক্সপোর্ট সাবসিডি কমিয়েছে এবং সরকার সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া। সরকারের পাশাপাশি রপ্তানিকারকদেরও সম্মিলিতভাবে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় কম। তবে রপ্তানি হয় বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি। বাংলাদেশ বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি যদি কমে তাহলে সামনে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক–কর কমতে পারে। আবার বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে গেলে শুল্কহার আরও বাড়তে পারে। অবশ্য ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এই পর্যালোচনা করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট করেনি দেশটি।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। এই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৬১৫ কোটি ডলার।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতিকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির পরিমাণ দিয়ে ভাগ করে যা পাওয়া যায়, তার শতাংশ ধরে ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর হার হয় ৭৪ শতাংশ। এর অর্ধেক বা ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে বাংলাদেশের পণ্যে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে কী কী আসে, কীভাবে আমদানি বাড়ানো যাবে, তাই এখন আলোচনার বিষয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে অভ্যন্তরীণভাবে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। শিল্প-কারখানাগুলোকে আরও কার্যকরী কীভাবে করা যায় তা চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি ভেল্যু চেইনকে সাবলীল করতে পরিকল্পনা করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যভান্ডারে দেখা যায়, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৯১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে ২৯ কোটি ডলার। অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পণ্য রয়েছে ২৬২ কোটি ডলারের।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাবের সঙ্গে এনবিআরের হিসাবের পার্থক্যের কারণ সময়ের ব্যবধান। এনবিআর পণ্য খালাসের পর হিসাব করে, যুক্তরাষ্ট্র পণ্য রপ্তানির সময় হিসাব করে। আরেকটি হলো, তৃতীয় দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আসছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে দেখানো হয়নি।
এনবিআরের হিসাবে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য আমদানি হওয়া ২৬২ কোটি ডলারের পণ্যের মধ্যে ১৩৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানিতে কোনো শুল্ক–কর দিতে হয়নি। যেমন গম, তুলার মতো পণ্যে শুল্ক–কর নেই। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যে গড়ে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ শুল্ক–কর দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে কাস্টমস শুল্ক–কর আদায় করেছে ১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা।
এবার দেখা যাক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোন পণ্য বেশি আসে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ হাজার ৫১৫টি এইচএসকোডের (পণ্যের শ্রেণি বিভাজন) পণ্য আমদানি হয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে আট ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে ৬৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রড তৈরির কাঁচামাল—পুরোনো লোহার টুকরা বা স্ক্র্যাপ। গত অর্থবছরে পণ্যটি আমদানি হয় ৭৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ। গড়ে ৪ শতাংশ শুল্কহার রয়েছে পুরোনো লোহার পণ্য আমদানিতে।
আমদানিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পণ্য হলো এলপিজির উপাদান বিউটেন। গত বছর এই পণ্য আমদানি হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের। বাংলাদেশের শুল্কহার গড়ে ৫ শতাংশ।
তৃতীয় সর্বোচ্চ আমদানি পণ্য হলো সয়াবিন বীজ। সয়াবিন তেল ও প্রাণিখাদ্য তৈরির এই কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৩২ কোটি ডলারের। এই পণ্য আমদানিতে শুল্ক–কর নেই।
চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা। এই পণ্য আমদানি হয়েছে ২৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের। এটিতেও শুল্ক–কর নেই।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির তালিকায় আরও রয়েছে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, হুইস্কি, গাড়ি, গম, উড পাল্প, পুরোনো জাহাজ, সয়াকেক, কাঠবাদাম ইত্যাদি।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া সর্বোচ্চ শুল্ক–কর আছে এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে হুইস্কি। হুইস্কিতে শুল্ক–কর ৬১১ শতাংশ। তবে আমদানি খুবই কম। গত বছর ২২৮ বোতল জ্যাক ডেনিয়েল হুইস্কি আমদানি হয়েছে দেশটি থেকে। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শুল্ক–করযুক্ত পণ্য হলো মার্সিডিজ বেঞ্চ। এই গাড়িতে শুল্ক–কর ৪৪৩ শতাংশ। গত বছর আমদানি হয়েছে চারটি গাড়ি।
ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানিতে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দেন। আমদানিতে খরচ কত এবং পণ্যের মান কেমন? তবে শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে কত কম সময়ে আনা যাবে, তা–ও গুরুত্ব দেন ব্যবসায়ীরা।
শুল্ক–করের হার সব দেশেই প্রায় একই। কিছু মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় (যেমন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা সাফটা) নির্ধারিত পণ্যে শুল্ক সুবিধা রয়েছে। এখন বেসরকারি আমদানিকারকদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে উৎসাহ দিতে হলে শুল্ক–করে সুবিধা দিতে হবে। কারণ, খরচ কম পড়লে সেখান থেকে আমদানিতে উৎসাহিত হবেন ব্যবসায়ীরা।
আবার যেসব পণ্যে শুল্কহার নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প ভাবতে হবে। যেমন এনবিআরের হিসাবে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ৪৪ শতাংশে কোনো শুল্ক–কর দিতে হয়নি। এই তালিকায় রয়েছে সয়াবিন বীজ, তুলা ইত্যাদি।
তবে আমদানিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সরকার। যেমন সরকার যেসব পণ্য আমদানি করে তার তালিকায় রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, এয়ারক্রাফট ও যন্ত্রাংশ, অস্ত্র ইত্যাদি। গত বছর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এয়ারক্রাফট ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ আমদানি করেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করেছে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি ডলারের।
পোশাক খাতের রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমাদের আমদানি বাড়ানোর বিকল্প নেই। সরকারি–বেসরকারি খাত মিলিয়ে যদি আমদানি বাড়াতে পারি, তাহলে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে। যেমন এখন যা আমদানি তা যদি দ্বিগুণ করা যায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের হার ২৪–২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তারা পর্যালোচনার ঘোষণা না দিলেও আমাদের প্রস্তুতি এখনই শুরু করে দেওয়া দরকার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি আমদানি বাড়িয়ে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এ রকম উদ্যোগ নেওয়া হলে রপ্তানি খাত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুল্ক–কর কমিয়ে কৃত্রিমভাবে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং দেশে মার্কিন বিনিয়োগ আনা হলে সহজভাবে আমদানি বাড়বে। কারণ, মার্কিন উদ্যোক্তারা নিজ দেশ থেকে বাংলাদেশে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানি করবেন।
তিনি বলেন, আমরা যেসব পণ্য রপ্তানি করি, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষের জন্য। আবার তাদের তুলা ব্যবহার করছি। বিষয়টি যদি আমরা যুক্তি দিয়ে দাঁড় করানো যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনায় নেয়, তাহলে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ প্রণোদনা দিতে পারে সরকার। তাছাড়া ট্রাম্পের সূত্র ব্যবহার করলে বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে ৮৫ শতাংশ এবং চীন থেকে পণ্য আমদানিতে ৯৫ শতাংশ শুল্ক বসাতে পারবে। এভাবে হলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে যাবে।
এনিয়ে জাহিদ হোসেন আরও বলেন, এই বাড়তি শুল্ক সরবরাহকারীরা নয়, ক্রেতারা পরিশোধ করবে এই বিষয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দরকার। যেমনটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবসায়ীরা করছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে গলাকাটা প্রতিযোগিতা থেকে বের হতে হবে। অর্থাৎ পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে কেউ যেন এই বাড়তি শুল্ক নিজের ওপরে চাপিয়ে না নেয়। বাড়তি শুল্ক ক্রেতাদের ওপরেই চাপাতে হবে।
তিনি বলেন, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-কে একটি যৌথ নীতি নির্ধারণ করতে হবে, যাতে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতার কারণে নিজ উদ্যোগে পণ্যের দাম কমিয়ে এই বাড়তি শুল্কের চাপ নিজের ওপর না নেন। যদি কেউ এই কৌশল না মানে, তাহলে তার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও রাখা উচিত।