প্রাথমিক শিক্ষার মান ও দক্ষতা বাড়াতে সরকার জুলাই থেকে ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ শুরু করতে চলেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ অধিবেশনে বুধবার (১৫ এপ্রিল) প্রশ্নোত্তর পর্বে চট্টগ্রাম-৭ আসনের হুমাম কাদের চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী সরকারের এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ইশতেহারে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষাদানের মান ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৯ জন এবং তার মধ্যে চলমান চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার জন শিক্ষককে ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। আপনি জেনে আনন্দিত হবেন যে, আগামী ১ জুলাই থেকে ৫ বছর মেয়াদি পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি সরকার শুরু করতে যাচ্ছে এবং এই কর্মসূচির মাধ্যমে অবশিষ্ট যে শিক্ষকবৃন্দ আছেন তাদেরকেও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা প্রদানের পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের রয়েছে।
হুমাম কাদের চৌধুরীর আরেকটি এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি স্কুল পরিচালনায় সরকারের একটি নীতিমালা রয়েছে।
গত ১০ এপ্রিল মূলতবির পর এদিন বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। দিনের কর্মসূচি অনুয়ায়ী প্রথমে ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব।
বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন,বর্তমান সরকার এমএসপি বা সমুদ্র অঞ্চল পরিকল্পনা কার্যক্রম এবং এ থেকে দেশের সম্ভাব্য অর্জিত বিষয় দিয়ে বিবেচনার জন্য ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সামুদ্রিক সম্পদ, মৎস, পর্যটন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং সুনীল অর্থনীতির টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি সক্রিয় ও বিবেচনাধীন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
আরেকটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের নির্বাচন ইশতেহারে ব্লু ইকোনমির বিষয়ে একটি কমবেশি ডিটেইল পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী সমুদ্র অঞ্চলগুলোতে বাস করছে ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ বিশাল একটি অংশে বাস করছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা যদি এই ব্লু ইকোনমি বলতে যে সকল অর্থনীতি যে সকল বিষয়গুলো এখানে আছে সেগুলোকে যদি আস্তে আস্তে অর্থনৈতিক সম্ভব্যতা বিবেচনা করে আমরা গড়ে তুলতে পারি তাহলে অবশ্যই বহু মানুষের জীবনযাত্রার মান আমরা পাল্টাতে সক্ষম হব। এই অঞ্চল এবং এই বিশাল অঞ্চলকে ঘিরে বিশাল একটি অর্থনীতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে অবশ্যই ইনশাআল্লাহ। এই সকল বিষয়ে বিবেচনা করেই আমরা আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছি এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এরই ভিতরে ধীরে ধীরে পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করা শুরু করেছে।
পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনি আপনার এলাকার যে সমস্যার (নদী ভাঙ্গন) কথা বলেছেন সেটি শুধু আপনার এলাকার সমস্যা নয় বাংলাদেশের বহু মানুষ আছে এমনকি আমার যেটা ডিস্ট্রিক্ট সেই বগুড়াতেও সারিয়াকান্দি অঞ্চলে এইরকম নদী ভাঙনের সমস্যা রয়েছে, একই সাথে আরো অনেকগুলো অঞ্চল আছে দক্ষিণ অঞ্চল বলেন উত্তর অঞ্চল বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এই সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যাটা একদিনের নয়। আপনি যেহেতু ওই অঞ্চলের মানুষ ওই অঞ্চলে বেড়ে উঠেছেন আপনার নিশ্চিত ধারণা আছে কিভাবে এই সমস্যাটি তৈরি হয়েছে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় দুটো বিষয় আছে…একটি হচ্ছে, নদী শাসনের কথা আপনি বলেছেন সেটি একটি উপায় আছে এবং একই সাথে আপনি খুব ভালো করে জানেন নদী শাসন এর বিষয়টি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি বিষয়। তারপরেও প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদেরকে করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এই নদী ভাঙনগুলো কখন হয়? ভাঙনগুলো আমরা দেখেছি, অধিকাংশ সময় বর্ষার সময় হয়ে থাকে যখন নদীতে স্রোত থাকে এবং হঠাৎ করে পানির প্রবাহ যখন বেড়ে যায়। সেই জন্যই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই সমস্যাটিকে সমাধানের জন্য খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। উনার সময় এবং বর্তমান সরকারও খাল খননের মাধ্যমে নদী ভাঙনকে ট্যাকেল করতে চাইছে। একদিকে যেমন আমাদের শুষ্ক মৌসুমে পানির যে সমস্যা হয়ে থাকে সেই সমস্যাটার সমাধান আমরা করতে চাইছি খাল খননের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, একইভাবে নিশ্চয়ই আপনার নিশ্চয়ই ধারণা আছে যেহেতু গ্রামাঞ্চলে আপনি বেড়ে উঠেছেন অনেক সময় এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে বর্ষাকালেও কৃষক পানি পায় না, বর্ষার সময় তাকে পানির জন্য কষ্ট করতে হয়। সেজন্য আমাদের সেচ সুবিধা দেওয়ার জন্য খাল খনন একটি অত্যন্ত জরুরি প্রকল্প।
আরেকটি ধারণা আছে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই সমস্যাটি আছে এবং গ্রামাঞ্চলে যেখানে চাষ খুব বেশি হয়ে থাকে সেখানে এই সমস্যাটি ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে…সেটি হচ্ছে যে আমাদের ভূগর্ভস্থ যে পানি আছে সেটি স্তর ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সবগুলো বিষয়কে যদি আমরা অ্যাড্রেস করতে চাই, তাহলে অবশ্যই নদী শাসন যেমন একটি প্রয়োজন নদীকে রোধ করার জন্য। ঠিক নদীতে যখন পানির প্রবাহ বেড়ে যায়, স্রোত বেড়ে যায় যার নদীকে সেই স্রোতটিকে যাতে আমরা মোটামুটি কন্ট্রোলে আনতে পারি সেই পানিকে নিয়ন্ত্রণের আনতে পারি, সেজন্য খাল খনন কর্মসূচিটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নদী শাসনের ব্যাপারে যেরকম আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করছি সরকারের পক্ষ থেকে।
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই এবং পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেবার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বেসামরিক বিমান, পরিবহন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জাতীয় পর্যটন, মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে এরই ভেতরে কাজ শুরু করেছে।
তিনি বলেন, এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নকে বিশেষভাবে আমরা গুরুত্ব দিতে চাইছি। একই সাথে পটুয়াখলী জেলার কুয়াকাটা মাননীয় সংসদ সদস্য এখানে আমি একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাইছি। যেই কুয়াকাটায় আমি গিয়েছিলাম একবার এবং সেই স্মৃতিটি আমার রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমার পিতার সাথে। সেজন্যই স্বাভাবিকভাবে এই অঞ্চলের প্রতি কিছুটা হলে আমার একটি দুর্বলতা রয়ে গিয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম জেলার পতঙ্গা আনোয়ারা সিবিচের মৌলিক সুবিধারী উন্নয়ন শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণের নিমিত্তে এর ভেতরেই সম্ভবত সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক কুয়াকাটা সংলগ্ন সাতটি উপজেলা কলাচিপা, কলাপাড়া, রাঙামালি, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা আমতলি এবং তালতলি নিয়ে পায়রা কুয়াকাটা কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান ফোকাসিং অন ইকোটুরিজম শীর্ষ গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে । অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যানের পর্যটনের অংশটুকু বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়ন করা হবে ইনশাআল্লাহ। এটি চূড়ান্ত হলে কলাপাড়া উপজেলাস্থ কুয়াকাটার পর্যটন খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে আমরা আশা করি।”
কুয়াঘাটায় বিমানবন্দর করা যাবে কী না জানতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেখুন বিমানবন্দরের বিষয়টি হচ্ছে এটিতো স্বাভাবিক অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত। বিমানের ফ্লাইট অবশ্যই পরিচালনা সেখানে করা হয়ত যাবে কিন্তু সেটি যদি লস হয় তাহলে তো পাবলিকের পকেট থেকে পয়সাটা যাবে। কাজেই সেটি বোধহয় বিজনেস ওয়াইজ খুব একটা ভালো হবে না।তবে কোন প্রাইভেট কোম্পানি যদি সেখানে ফ্লাইট অপারেট করতে চায় আমরা সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা করব সেখানে তাকে ইনফ্রাস্ট্রাকচারটা যতটুকু সম্ভব তৈরি করে দেওয়ার জন্য। তবে অবশ্যই যাচাই বাছাইয়ের ভিত্তিতে আমাদেরকে এটি করতে হবে। কারণ সরকার যেরকম আমরা লস চাই না, আমরা চাই না কোন উদ্যোক্তা উদ্যোগ গ্রহণ করে সেটাতে তারা ব্যর্থ হোক।
দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যে দলটিকে বিগত নির্বাচনে এই দেশের মানুষ বিপুল ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে দেশকে পরিচালনা করার জন্য। এই দলের কমিটমেন্ট হচ্ছে এই দেশের মানুষের প্রতি, এই দলের কমিটমেন্ট হচ্ছে এই বাংলাদেশের প্রতি। সেজন্যই আমাদের যে নির্বাচনি ইশতেহার ছিল সেখানে যেরকম আমরা শিল্পোদ্যোক্তা যারা আছেন তাদের জন্য যেরকম পলিসি গ্রহণ করেছি, একইভাবে খেটে খাওয়া মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ, ওয়ার্কিং ক্লাস বা খেটে খাওয়া মানুষ তারা কিভাবে ধীরে ধীরে তাদের জীবনযাত্রা মান উন্নয়ন করতে পারে সেজন্য আমরা বিভিন্ন রকম পলিসি গ্রহণ করেছি, আমরা বিভিন্ন রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছি এবং প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজও আমরা শুরু করে দিয়েছি।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বৃক্ষরোপন, খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাশনালয়ের ধর্মগুরু, পেশাদার ক্রীড়াবিদদের ক্রীড়া কার্ডসহ বিষয় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
নির্ধারিত ৩০ মিনিটের প্রশ্নত্তোর পর্বে চারটি তারকা চিহ্নিত ও সম্পুরক প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তার জন্য লিখিত প্রশ্ন ছিল ৭টি।