কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের উত্তর গণেশপুর খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে অনিয়ম, স্বচ্ছতার অভাব ও সরকারি রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদের সাত সদস্য একযোগে ইজারা বাতিল করে নতুন করে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইজারা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীরা হলেন ইউপি সদস্য জসিম উদ্দিন, হারুন মিয়া, রোস্তম, মো. মোতালেব মিয়া এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য আলফিনা আক্তার, মুক্তা আক্তার ও মাহমুদা তাসলিমা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, উত্তর গণেশপুর খেয়াঘাটটির বর্তমান ইজারার মেয়াদ শেষ হয় গত ৩১ চৈত্র। এর আগে প্রতি বছর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত প্রক্রিয়া ও সভার মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হলেও বাংলা ১৪৩৩ সনের জন্য সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ইজারার মূল্য নিয়ে। গত বছর যেখানে ইজারামূল্য ছিল ১৯ হাজার ৮০০ টাকা, সেখানে নতুন বছরে তা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ হাজার ৯০০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে মাত্র ১০০ টাকা। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একটি গুরুত্বপূর্ণ খেয়াঘাটের ক্ষেত্রে এত সামান্য মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক এবং এতে সরকারের রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁদের দাবি, চেয়ারম্যান সাময়িক বরখাস্ত থাকায় বর্তমানে প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মালিক তানভীর হোসেন কোনো সভা আহ্বান না করেই এবং অধিকাংশ সদস্যকে না জানিয়ে গত ১২ এপ্রিল ইজারা দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গণেশপুর খেয়াঘাটের ইজারা প্রক্রিয়া ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি মহলের প্রভাব রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, খেয়া পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ ইজারায় অংশ নিতে পারেন না। এই বিধিনিষেধকে কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালীরা নিজেদের লোকজনের মাধ্যমে ইজারা নিয়ে পরে ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন এই খেয়াঘাট থেকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ফলে ঘাটটি ঘিরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী সদস্য মাহমুদা তাসলিমা বলেন, “আমাদের কোনো সভায় ডাকা হয়নি, এমনকি আগে জানানোও হয়নি। এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গোপনে নেওয়া হয়েছে। কাগজে স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য আমাকে ৭০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি।”
আরেক সদস্য মুক্তা আক্তার বলেন, “এই খেয়াঘাট থেকে আরও বেশি রাজস্ব আসার সুযোগ ছিল। কিন্তু স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।”
ইউপি সদস্য জসিম উদ্দিন বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করলে আরও বেশি মূল্যে ইজারা দেওয়া সম্ভব ছিল। সদস্য হারুন মিয়া বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা মুমতাজ পাটনী বলেন, তিনি ১০ লাখ টাকায় ইজারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও তাঁকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুতারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মালিক তানভীর হোসেন। তিনি বলেন, খেয়াঘাট ইজারার জন্য পাঁচজন আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে একজন বাদ পড়েন। পরে নিয়ম মেনেই প্রকাশ্যে নিলামের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে সব ইউপি সদস্যকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছিল। কয়েকজন সদস্য চিঠি গ্রহণ করেননি।
করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে মুসলিমা বলেন, খেয়াঘাটের ইজারা নিয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে শুনানি শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।