কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে ডুবে যাওয়া বোরোক্ষেতের মাঝে অবশেষে দেখা মিলেছে দুদিনের রোদের। সেই রোদ যেন কৃষকের শেষ আশ্রয়। পানিতে তলিয়ে পচে যাওয়ার উপক্রম ধান, খলায় স্তূপ করে রাখা চারা গজানো ফসল আর কাদামাখা জমির ভেতর এখন চলছে অবশিষ্ট ফসল বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
কেউ কোমরসমান পানিতে নেমে ডুবন্ত ধান কাটছেন, কেউ খলায় রাখা ভেজা ধান থেকে ভালো অংশ আলাদা করছেন, আবার কেউ উদ্ধার করা ধান রোদে শুকিয়ে খাদ্যোপযোগী করার চেষ্টা করছেন।
রবিবার (১০ মে) সকালে ইটনা উপজেলার ঢাকী ইউনিয়নের শান্তিপুর ও সদর ইউনিয়নের নূরপুর এলাকার বিস্তীর্ণ হাওড়জুড়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
ইটনা সদর ইউনিয়নের দীঘীরপাড় গ্রামের কৃষক দাউদ সালেক মিয়া বলেন, এবার তিনি আট একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন একরের মতো ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকি সাড়ে চার একর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “এই ফসল দিয়াই সংসার চলে। এবার মহাজনের ঋণ, ব্যাংকের ঋণ—কোনোটাই শোধ করার উপায় থাকল না।”
দাউদ সালেক মিয়া জানান, আগে অকালবন্যায় ধান ডুবে গেলে স্থানীয় নিম্ন আয়ের মানুষ বা শ্রমিকেরা ‘তে ভাগা’ পদ্ধতিতে ডুবন্ত ধান কেটে নিতেন। এক ভাগ পেতেন শ্রমিকেরা, দুই ভাগ থাকত জমির মালিকের। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ‘নয়ন ভাগা’য় পুরো ফসলই কেটে নিয়ে যেতে বলা হতো। কিন্তু এবার সেই আগ্রহও নেই।
তার ভাষায়, “এখন কাঁচা ধান ৪০০ টাকা মনেও বিক্রি হয় না। পানির নিচে ধান কাটতে যত কষ্ট, ওই সময় অন্য কাজ করলে তিন-চার গুণ বেশি আয় হয়।”
তবে গত দুদিনের রোদ কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, “খলায় রাখা চারা গজানো ধান থেকে ভালো ধান আলাদা করে শুকাচ্ছি। আবার কিছু ডুবন্ত ধানও কষ্ট করে তুলে আনার চেষ্টা করছি, অন্তত বছরের খাবারটা জোগাড় করার জন্য।”
নূরপুর এলাকার কৃষিশ্রমিক কালা মিয়া বলেন, “এখন দিনমজুরি এক হাজার টাকা। পানির নিচে ধান কাইটা যে টাকা পাওয়া যায়, তাতে চলা যায় না। তাই ক্ষেতের মালিকরাই নিজেরা যদ্দুর পারেন ধান তুলতেছেন।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, শুধু প্রণোদনা বা স্বল্পমেয়াদি সহায়তা দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। তারা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মহাজনি, ব্যাংক ও এনজিও ঋণ মওকুফের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হাওরে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান চান তারা।
কৃষকদের অনেকে অভিযোগ করেন, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণসহ পরিবেশবিনাশী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে হাওরে স্বাভাবিক পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা বেড়ে ক্ষতির মাত্রাও বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় এবার ব্যাপক বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলার ১৩ হাজার ১২২ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার কৃষক। কৃষি বিভাগের হিসাবে, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন উপজেলায়। এর মধ্যে ইটনায় ৩ হাজার ২৬১ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে প্রায় ৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অষ্টগ্রামে ২ হাজার ৭০৩ হেক্টরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তাড়াইলে ১ হাজার ২২৪ হেক্টর জমিতে প্রায় ২৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং নিকলীতে ৯২৩ হেক্টরে প্রায় ২১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এ ছাড়া করিমগঞ্জে ৮৩০ হেক্টর, মিঠামইনে ৬৯০ হেক্টর, কটিয়াদীতে ৫৮৫ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ২৭৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে কৃষকদের দাবি, সরকারি হিসাবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্র উঠে আসেনি। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ এখনো চলছে।