কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া-নোয়াগাঁও অলওয়েদার সড়ক একসময় পরিচিত ছিল ‘হাওরের বিস্ময়’ হিসেবে। প্রায় সাত বছর আগে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক হাওরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। কিন্তু এখন মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ে সড়কটির বড় একটি অংশ বিলীনের ঝুঁকিতে রয়েছে। আর এ পরিস্থিতির দায় এড়াতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) একে অপরের দিকে আঙুল তুলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভাঙনের তীব্রতায় ইতিমধ্যে সড়কের বেশ কিছু অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অন্তত এক কিলোমিটার এলাকা। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ফসলি জমি ও একাধিক বিদ্যুতের খুঁটি। এতে নোয়াগাঁও ও উসমানপুর গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, “নদীভাঙনে আগে জমি গেছে, পরে বিদ্যুতের খুঁটিও বিলীন হয়েছে। কয়েকদিন বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। পরে নতুন করে খুঁটি বসিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করা হয়।”
ভাঙনের কারণে বিদ্যুতের খুঁটি ধসে পড়ায় দুই গ্রামে টানা পাঁচ দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। পরে নতুন খুঁটি স্থাপন করে সংযোগ পুনরায় চালু করে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙনের লক্ষণ দেখা গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা নেয়নি। ফলে পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বাঙ্গালপাড়া এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন আলম বলেন, “ভাঙনের শুরু থেকেই বিষয়টি এলজিইডিকে জানানো হয়েছিল। কর্মকর্তারা এলাকায় এলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
এদিকে সড়কের শেষ প্রান্তে মেঘনা নদীর ওপর প্রায় ১৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে এক হাজার মিটার দীর্ঘ বাঙালপাড়া-চাতলপাড় সেতু। স্থানীয়দের আশা ছিল, সেতুটি চালু হলে নোয়াগাঁওয়ের সঙ্গে অষ্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। কিন্তু সড়ক ভেঙে পড়ায় পুরো পরিকল্পনাই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান রুস্তম বলেন, “সেতু নির্মাণের কাজ চলমান। কিন্তু সংযোগ সড়কই যদি না থাকে, তাহলে এত বড় প্রকল্পের সুফল মানুষ কীভাবে পাবে?”
স্থানীয় বাসিন্দা ইসলাম উদ্দিন বলেন, “জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়ার পথও এখন ঝুঁকির মধ্যে। যেকোনো সময় যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।”
কিশোরগঞ্জ এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে অলওয়েদার সড়কটি নির্মাণ করা হয়। সম্প্রতি আরও ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হয়। কিন্তু কাজ চলাকালীন সময়েই নদীভাঙন শুরু হওয়ায় পুরো প্রকল্পটি নতুন করে হুমকির মুখে পড়ে।
এলজিইডির অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক বলেন, “সড়কের পাশেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ভাঙনের বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছিল। কিন্তু দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “এলজিইডির পক্ষ থেকে ৭ মে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়। আগে অবহিত করা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো। বর্তমানে নদীর গভীরতা বেড়ে যাওয়ায় কাজ কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছে। তারপরও জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
অষ্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ইনচার্জ হাবিবুর রহমান বলেন, “নদীভাঙনে আগের খুঁটি বিলীন হয়ে যাওয়ায় নতুন খুঁটি স্থাপন করে পুনরায় সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।”
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ না করলে গুরুত্বপূর্ণ এই অলওয়েদার সড়ক পুরোপুরি নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে। এতে হাওরাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।