চট্টগ্রামে মৌসুমের রেকর্ড বৃষ্টিপাতের পর নগরীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি নিচু এলাকায় স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরো পাঁচ দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পতেঙ্গা কেন্দ্র জানায় মঙ্গলবার বেলা ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘন্টায় ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে আমবাগান আবহাওয়া অফিসে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
রোববার সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি সোমবার অতি ভারি বর্ষণের রূপ নেয়। সোমবার দিনভর বৃষ্টির পর রাতেও চলে মুষলধারে।
সেদিন সন্ধ্যার পর নগরীর দুয়েকটি স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। রাতভর টানা ভারি বৃষ্টির পর মঙ্গলবার সকালেও বৃষ্টির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
এর ফলে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, সিডিএ আবাসিক এলাকা, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, কাপাসগোলা, চকবাজার, হালিশহর কে ও এল ব্লক, রামপুর, তিন পোলের মাথা, বাটালি রোড, আরাকান সড়কের মৌলভী পুকুর পাড়, সিঅ্যান্ডবি এলাকাসহ কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলাবদ্ধ এলাকার সংখ্যা বাড়ছে। নগরীর বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে পাহাড় ধোয়া মাটি নেমে আসতে দেখা গেছে।
চট্টগ্রামের আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্রের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চলতি মৌসুমে এটা ২৪ ঘণ্টার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। গত কয়েক বছরের মধ্যেও এটি সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত। নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।
“এর ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীগুলোর পানি বেড়ে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। শহরে পানি আটকে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে। যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে অত পানি দ্রুত নামা খুব কঠিন। এছাড়া জোয়ারের সময় পানি সাগরে নামতে পারে না। ভাটার সময় নামবে। আগামী কয়েকদিন থেমে থেমে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকবে।”
এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জমে যাওয়া পানি সরাতে মাঠে কাজ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) একাধিক টিম। সঙ্গে সেনাবাহিনীর ২০টি দল কাজ করে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, “আমাদের প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল আছে। এরমধ্যে হিজরা খালের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় মূল সড়ক থেকে রাস্তার লেবেল নিচু। সে কারণে সেখানে পানি উঠে যায়। সেখানে পানি নিষ্কাশনে পাম্প বসানো হয়েছে।”
বিভিন্ন খালের মুখে যে রেগুলেটর বসানো হয়েছে, সেগুলো মনিটর করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জলাবদ্ধতার কারণে সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী। সড়কে রিকশা ছাড়া অন্য যানবাহনের সংখ্যা দেখা গেছে খুবই কম। নগরীর কয়েকটি স্কুলের ক্লাস ও পরীক্ষা ‘বৈরী আবহাওয়ার’ কারণে স্থগিত করা হয়েছে।
সকালে কাতালগঞ্জ এলাকায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, “গতকাল সকাল থেকে যে ভারি বৃষ্টি শুরু হয়েছে তা এখনো থামেনি। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। পুরো শহর গতকাল থেকে ঘুরে দেখেছি।”
ভারি বর্ষণে লালখান বাজারে দুতিনটি বড় গাছ ভেঙে পড়েছে এবং বিমানবন্দর সড়কে একটি সড়ক ভেঙে গেছে বলে জানান মেয়র শাহাদাত হোসেন। পরে দুপুরে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শনে যান তিনি।
সিডিএ এর প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, “পতেঙ্গা এলাকায় ফ্লাইওভারের কাজের জন্য মূল সড়কের পাশে গাড়ি চলাচলের সুবিধার্থে একটি বাইপাস সড়ক করা হয়েছিল। বেশি বৃষ্টিতে বাইপাস সড়কটির শোল্ডারের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। ঠিকাদার মেরামত কাজ শুরু করেছে। সেখানে আমাদের লোকজনও আছে। নগরীর আর কোথাও ক্ষয়ক্ষতি কোনো খবর এখনো পাইনি।”
চট্টগ্রাম নগরীতে অন্যান্য সময় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা হত। গত এপ্রিলের শেষেও নগরীর প্রবর্তক মোড়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, জিইসি, মুরাদপুর, রহমতগঞ্জ, সিরাজদ্দৌলা সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়।
এরপর সমালোচনার মুখে হিজরা খাল ও জামালখান খালের বাঁধ কেটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মে মাসের মধ্যে এসব বাঁধ সরিয়ে নিয়ে চলতি বর্ষা মৌসুমের জন্য খাল দুটির সংস্কার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।