muktijoddhar kantho logo l o a d i n g

দূর পরবাস

মিশরে মানব পাচারকারীর কবল থেকে চার বাংলাদেশির মুক্তির নেপথ্যের গল্প

মিশরে মানব পাচারকারীর কবল থেকে চার বাংলাদেশির মুক্তির নেপথ্যের গল্প

ঠিক দুই বছর আগে অচেনা একটি নম্বর থেকে ফোন এলো। রিসিভ করতেই ওপাশে একজন হাউমাউ করে কাঁদছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে? কাঁদছেন কেন?

তিনি বললেন, আমার নাম আবুল কাসেম। মিশরের আশরা রামাদান থেকে বলছি। বাড়ি কিশোরগঞ্জ। অনেক চেষ্টা করে আপনার নম্বর পেয়েছি। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমাদের বাঁচান।

আমি জানতে চাইলাম, কী হয়েছে?

তিনি বললেন, “আমি কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার সরারচর ইউনিয়ন পরিষদে চাকরি করতাম। নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়ন পরিষদে চাকরী করতো মোহাম্মদ শরীফ মিয়া। সেই কারপাশা জালালপুর গ্রামের (মিশরে বসবাসরত) জহির মিয়া ও মিনা বেগম নামের এক দম্পতি দালাল ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে আমি আবুল কাসেম, মোহাম্মদ শরীফ মিয়া এবং কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা মোঃ জামান মিয়াকে মিশরে নিয়ে এসেছে। প্রায় তিন মাস ধরে আমাদের একটি ঘরে অনেকটা বন্দি করে রেখেছে। কারপাশা ইউনিয়নের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ শরীফ মিয়ার স্ত্রী ফুলনাহার বেগম কে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা বলে এনে সেই দালালের বাসায় রেখে গৃহকর্ম করানো হচ্ছে। আমরা ৪জন—আমি, আমার বন্ধুর স্ত্রী দুই বন্ধু। আমাদের দেশে ফিরতে সাহায্য করুন।

আমি বললাম, বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করুন। তিনি জানালেন, দূতাবাসের কোনো নম্বর তাদের কাছে নেই। এমনকি নিজেদের কোনো মোবাইল ফোনও নেই। অন্য একজনের ফোন থেকে সুযোগ পেয়ে আমাকে কল করেছেন।

আমি দালালের নাম ও ফোন নম্বর চাইলে তিনি তা দিয়ে ফোন কেটে দেন।

কিছুক্ষণ পর আমার WhatsApp-এ বাংলাদেশ থেকে সেই দালালের পাসপোর্টের কপি, ছবি, ফেসবুক লিংক এবং আবুল কাসেম ও আরেকজন ভুক্তভোগীর দুটি ভিডিও পাঠানো হয়। ভিডিও গুলোতে তাদের অমানবিক ও অসহায় জীবনযাপনের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছিল।

সেদিন রাতেই আমি দালালকে ফোন করি। তিনজনের নাম উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করি, এদের চেনেন?

প্রথমে তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। পরে স্বীকার করে বলেন, হ্যাঁ, আমি এনেছি। গার্মেন্টসে চাকরি দিয়েছি। এরপর উল্টো আমাকে ধমক দিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে আর যতবারই ফোন করেছি, তিনি আর রিসিভ করেননি।

পরদিন সকালে আমি বিষয়টি বাংলাদেশে দূতাবাসের তৎকালীন শ্রম কাউন্সিলর জনাব ইসমাইল হোসেনকে জানাই এবং দালালের নম্বর দিয়ে আবুল কাসেমদের সহায়তার অনুরোধ করি।

দূতাবাস থেকে আবুল কাসেমকে যোগাযোগ করে আসতে বলা হলে তিনি জানান, তার ডিউটি রয়েছে, পরের সপ্তাহে আসবেন। কিন্তু পরের সপ্তাহে তিনি নিজে না এসে তার স্ত্রীকে পাঠান। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তিনি শ্রম কাউন্সিলের সামনে ঘটনার সবকিছুই অস্বীকার করেন।

এদিকে আমি কিশোরগঞ্জের কয়েকটি পাবলিক ফেসবুক গ্রুপে দালালের ছবি ও ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে একটি পোস্ট করি। পোস্টটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য শুরু হয়। সে সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা পোস্টটি মুছে ফেলার জন্য আমাকে হুমকি দেন। কিন্তু আমি পোস্টটি সরাইনি।

পরদিন আবুল কাসেম দালালের ফোন থেকেই আমাকে কল করে বললেন, স্যার, দালাল বলেছে আগামীকাল আমাদের দেশে পাঠিয়ে দেবে। আপনি দয়া করে পোস্টটি ডিলিট করে দিন।

পরদিন বিমানবন্দর থেকে আবার ফোন করে তিনি বললেন, স্যার, আমরা দেশে ফিরে যাচ্ছি। আপনার জন্য আমরা নতুন জীবন পেলাম। আপনি যদি কখনো দেশে আসেন, তাহলে শুধু একবার আপনার সঙ্গে দেখা করে সালাম করতে চাই।

কয়েক মাস পর দেশে গিয়েছিলাম। তিনি বারবার মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেছিলেন, দেখা করার অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু সময়ের স্বল্পতায় আর দেখা হয়ে ওঠেনি।

আজ হঠাৎ তার টাইমলাইনে কাসেম ও তার পরিবারের এই ছবিটি চোখে পড়তেই সেই দুই বছর আগের ঘটনাগুলো একে একে মনে ভেসে উঠল। মনে হলো, এই ঘটনাটি আবারও লেখা উচিত—যাতে মানুষ বুঝতে পারে, বিদেশে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানব পাচারকারীরা কত নিষ্ঠুরভাবে অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। কারণ বিদেশে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে মানব পাচারকারীরা আজও অসংখ্য নিরীহ মানুষকে প্রতারণার জালে আটকে ফেলছে। অনেকেই হারিয়ে ফেলছেন অর্থ, সম্মান, স্বাধীনতা—কখনো কখনো নিজের জীবনও।

প্রবাসে যাওয়ার আগে দালাল নয়, যাচাই করা বৈধ পথ বেছে নিন। মনে রাখবেন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, একটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।

Tags: