muktijoddhar kantho logo l o a d i n g

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পকে হত্যায় ‘ইরানের ষড়যন্ত্রের খবর’ ইসরায়েল ছড়িয়েছে, সন্দেহ তুরস্কের

ট্রাম্পকে হত্যায় ‘ইরানের ষড়যন্ত্রের খবর’ ইসরায়েল ছড়িয়েছে, সন্দেহ তুরস্কের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যায় ইরানের পরিকল্পনা রয়েছে—এমন একটি ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে তুরস্কের কর্মকর্তারা সন্দেহের চোখে দেখছেন। তাদের ধারণা, তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আলোচনা ভেস্তে দিতে এবং ট্রাম্প ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার ওই তথ্য ছড়িয়ে থাকতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৮ জুলাই দুপুর ২টার দিকে সাংবাদিকরা জানতে পারেন, তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনী আঙ্কারা বিমানবন্দরে অস্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করছে। সেখানে তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী এয়ার ফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজটি অবস্থান করছিল।

৭ ও ৮ জুলাই নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আঙ্কারা কার্যত নিরাপত্তাবেষ্টিত ছিল। বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, ফুটপাতও ছিল নিয়ন্ত্রিত। সরকারি কর্মীদের এক সপ্তাহের প্রশাসনিক ছুটি দেওয়া হয়েছিল এবং শহরের অধিকাংশ এলাকা ছিল প্রায় জনশূন্য।

সম্মেলন উপলক্ষে তুরস্ক সরকার তুর্কি বিমানবাহিনীর ঘাঁটি ইতিমেতগুত এয়ার বেজকে, যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে আঙ্কারা বিমানবন্দর নামে পরিচিত—বিশেষভাবে প্রস্তুত করেছিল। এর ফলে রাষ্ট্রপ্রধানরা মাত্র ১০ মিনিটে সম্মেলনস্থলে পৌঁছাতে পারতেন।

এমন ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের তুর্কি কর্মকর্তাদের জানান, ইসরায়েল থেকে পাওয়া একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—ইরান ট্রাম্পকে হত্যা করতে পারে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানান, ইরানের একটি স্লিপার সেল আঙ্কারা বিমানবন্দরের কাছে ট্রাম্পের নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে বলে ওই প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, ধারণা করা হয়েছিল, ইরানিরা বিমানবন্দর থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান নিয়ে ম্যানপ্যাডস নামে পরিচিত কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে উড়োজাহাজটিতে হামলা চালাতে পারে।

তুরস্কের রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এসেনবোগা বিমানবন্দরের তুলনায় আঙ্কারা বিমানবন্দরটি বেসামরিক স্থাপনায় ঘেরা। রানওয়ের কাছাকাছি কিছু ভবন মাত্র ৫০০ মিটার দূরত্বে রয়েছে। এ কারণে তুর্কি কর্মকর্তারা আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেন।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান, মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসও অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল। প্রথমে ট্রাম্পের আঙ্কারা বিমানবন্দর থেকে যাত্রার পরিকল্পনা পরিবর্তন করে এসেনবোগা বিমানবন্দর নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সীমানা থেকে বেসামরিক ভবনগুলো তুলনামূলক দূরে। পরে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান আবার আনা হয়, কারণ এতে নতুন উড়োজাহাজটির তুলনায় বেশি কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল।

ইরান এর আগে দুবার ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে বলে অভিযোগ ওঠায় মার্কিন কর্মকর্তাদের অনেকের কাছেই নতুন এই হুমকিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানি নাগরিক আসিফ মার্চেন্টকে মার্কিন রাজনীতিকদের হত্যার কথিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ট্রাম্পও ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মার্কিন বিচার বিভাগ আফগান নাগরিক ফারহাদ শাকারির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ইরান সরকার তাকে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করতে নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ইরান ট্রাম্প বা অন্য কোনো মার্কিন কর্মকর্তাকে ‘টার্গেট’ করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সর্বশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়টি সিক্রেট সার্ভিস এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল যে, দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার পর ট্রাম্পকে গোপনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। তাকে একটি ক্যাটারিং গাড়িতে করে সঙ্গে থাকা মার্কিন সরকারি উড়োজাহাজ সি-৩২-এ নেওয়া হয়।

বিষয়টি সম্পর্কে এক তুর্কি কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মার্কিন কর্মকর্তারা সি-৩২ উড়োজাহাজ অবতরণের জন্য অতিরিক্ত অনুমতিও চেয়েছিলেন এবং শেষ মুহূর্তে বিভিন্ন পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। এতে আঙ্কারার কর্মকর্তাদের মনে হয়েছিল, পরিস্থিতিতে কোনো অস্বাভাবিকতা রয়েছে।

তুরস্কের কর্মকর্তাদের বরাতে মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি এমন এক সংবেদনশীল সময়ে আসে, যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প আলোচনা করছিলেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি তিনি আলোচনার বিষয়ে আশাবাদও প্রকাশ করেছিলেন বলে বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছে।

ট্রাম্পের এই অবস্থান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ছিল। নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে আবারও সংঘাত শুরুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় আরও ব্যাপক হামলা এবং দেশটির নেতাদের লক্ষ্য করে নতুন করে হত্যাচেষ্টার অভিযান চালানোর বিষয়ও ছিল।

‘এই প্রতিবেদন সত্য হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না’

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তুরস্কের কর্মকর্তারা বলছেন—তাদের ধারণা ‘ট্রাম্পকে হত্যার ইরানি পরিকল্পনা’ নিয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সম্ভবত নেতানিয়াহু সরকারের একটি কৌশল ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলকে ট্রাম্পের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরা, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে দেওয়া এবং ট্রাম্পের সঙ্গে এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করা।

কথিত হত্যাচেষ্টার এক দিন আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ২০১৯ সালে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার কারণে তুরস্কের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং আঙ্কারার কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে তিনি প্রস্তুত। তবে নেতানিয়াহু তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির তীব্র বিরোধিতা করেন। তার যুক্তি, এতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে এবং ইসরায়েলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, তারা প্রতিবেদনটিকে অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের যতটা সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাদের কাছে খুব স্পষ্ট ছিল, এই প্রতিবেদন সত্য হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।

তুরস্কে ইরানের কিছু গোপন ইউনিট অতীতে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের অপহরণ বা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকলেও, তেহরান সেখানে সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্রের বাইরে আরও জটিল কোনো অভিযান চালানোর সাহস কখনো দেখায়নি বলে ওই সূত্র দাবি করেন।

আঙ্কারার এক সূত্র মন্তব্য করেন, ‘যে হামলা কখনো ঘটেনি এবং সম্ভবত কখনো পরিকল্পনাই করা হয়নি, তার জন্য বীরের প্রয়োজন হয়েছে—আমার মনে হয়।’

এ ধরনের হামলা চালাতে তুরস্ক সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান, নিরাপদ আশ্রয়স্থল, আঙ্কারায় প্রবেশ ও বের হওয়ার গোপন পথ এবং সম্মেলনের আগে অসংখ্য সড়ক অবরোধ ও নিরাপত্তা তল্লাশিচৌকি পার করে ম্যানপ্যাডস পরিবহনের প্রয়োজন হতো।

এ ধরনের কোনো হামলার চেষ্টা তুরস্ককে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারত। যুদ্ধ শুরুর পরও ইরানের সঙ্গে আঙ্কারা তুলনামূলক স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

ইরানি কর্মকর্তারা এর আগে একাধিকবার তুরস্ককে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাদের দাবি, পশ্চিম ইরানে সশস্ত্র ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার জন্য মোসাদ ও সিআইএর ষড়যন্ত্রে তুরস্ক সমর্থন দেয়নি।

আঙ্কারার ওই সূত্র আরও বলেন, সম্মেলনের মাত্র এক মাস পর ট্রাম্পকে সুরক্ষিত রাখতে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের পরিচালিত অভিযানের বিস্তারিত তথ্য ফাঁস হওয়াটিও বেশ হাস্যকর বিষয়।

Tags: