muktijoddhar kantho logo l o a d i n g

আবহাওয়া ও জলবায়ু

ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর হতে পারে ২০২৬

ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর হতে পারে ২০২৬

এল নিনো আবহাওয়া চক্রের প্রভাবে ২০২৬ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর হিসেবে রেকর্ড গড়ার প্রবল আশঙ্কার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক গবেষণা সংস্থা বার্কলে আর্থের বৈশ্বিক আবহাওয়া-সংক্রান্ত নতুন এক বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সাল ২০২৪ সালের সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড অতিক্রম করতে পারে। ২০২৬ সালে তা না হলেও, ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়া প্রায় নিশ্চিত।

বার্কলে আর্থের প্রধান বিজ্ঞানী রবার্ট রোড গত বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে আমরা আবহাওয়া ও প্রকৃতির এক চরম রূপ দেখতে পাব। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, যা স্বাভাবিক গতিতে আরও অন্তত এক দশক পর আসার কথা ছিল। এটি বৈশ্বিক পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বড় সংকট তৈরি করবে।

প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলের পানি অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াই হলো এল নিনো। মাসের পর মাস স্থায়ী হওয়া এই আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে সারা বিশ্বে চরম বিপর্যয় দেখা দেয়। এর প্রভাবে পশ্চিম ও দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতে ভয়াবহ খরা ও শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলসহ কিছু এলাকায় দেখা দেয়, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি।

বিজ্ঞানীরা পূর্ব ট্রপিক্যাল প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা মেপে এল নিনোর তীব্রতা নির্ধারণ করেন। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার মহাসাগরের ওই নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। উল্লেখ্য, ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময়েও এ তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

২০২৬ সালের বসন্তের শেষ ও গ্রীষ্মের শুরুতে যে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল, তাতে এল নিনোর সরাসরি প্রভাব ছিল না; কারণ প্রক্রিয়াটি তখন কেবল দানা বাঁধছিল।

বার্কলে আর্থের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের জুনে শুরু হওয়া এই এল নিনো ধারণার চেয়েও দ্রুতগতিতে শক্তিশালী হচ্ছে। ফলে ২০২৬ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর হওয়ার সম্ভাবনা জুলাইয়ে যেখানে ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, আগস্টে তা এক লাফে দাঁড়িয়েছে ৬৯ শতাংশে।

এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে এর আংশিক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গত মাসে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় অংশ তীব্র তাপপ্রবাহে পড়েছে। আবহাওয়ার তথ্যানুযায়ী, জুলাই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত অথবা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উত্তপ্ত মাস। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে ই জুলাইয়ের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৯০ বছর আগের ডাস্ট বোল যুগের ঐতিহাসিক রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি তুলে ধরে বিজ্ঞানী রবার্ট রোড রসিকতা করে বলেন, কোথায় গরম পড়েনি তা বলা এখন সহজ—যেমন এই মুহূর্তে কেবল অ্যান্টার্কটিকায় তীব্র শীতকাল চলছে।

অনেক দেশেই, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোয়—এল নিনোর ফলে সৃষ্ট অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির প্রভাব চলমান ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতিকে আরও মারাত্মক করে তুলবে। আবহাওয়ার এই আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে, যেমন সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে অ্যানচোভিস মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বার্ষিক তাপমাত্রার এই সাময়িক রেকর্ড নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা মনে করিয়ে দেন, জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে দশকের পর দশকজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায়, আর এল নিনো কেবল নির্দিষ্ট একটি বছর বা মাসের ওপর সাময়িক প্রভাব ফেলে। তবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সার্বিক মূল সংকট হিসেবে প্রতিনিয়ত থেকে যাচ্ছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে বার্কলে আর্থের জলবায়ু বিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার বলেন, জলবায়ুর ওপর এল নিনোর প্রভাব হলো একটি বিশাল হাতুড়ির আঘাতের মতো; যা পৃথিবীর আবহাওয়া ব্যবস্থাকে পুরোপুরি তছনছ করে দেবে।

Tags: