সরকার গঠনের ছয় মাসের শেষ দিনে কিশোরগঞ্জে আসেন প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান। ইতিহাস ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ইদগাহ ও পাগলা মসজিদের শহরের দিনভর ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন উন্নয়নমুলক কর্মসুচি নিয়ে। কর্মসুচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উন্নয়নে বিএনপি সরকারের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘জনগণের সমর্থন সরকার গঠন করেছে। এই সমর্থন দিয়ে আপনারা আস্থা রেখেছিলেন বিএনপির উপরে। পরিষ্কারভাবে আমি বলে দিতে চাই, ইনশল্লাহ আপনারা আস্থা ধরে রাখুন, বিএনপি আপনাদের সাথে ছিল, বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের পাশে আছে,বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের সাথে থাকবে।’
গতকাল রবিবার সকালে কিশোরগঞ্জ পৌঁছে পাকুন্দিয়ায় প্রথম কর্মসূচিতে সমাবেশে জনগণের উদ্দেশ্যে এই আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের জন্যই কাজ করবে। যতদিন বিএনপি টিকে থাকবে ইনশাআল্লাহ। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের বাইরে কোন কাজ করবে না।’
পাকুন্দিয়ায় পৌঁছে প্রধান মন্ত্রী মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় ব্রক্ষপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন। বেলা সাড়ে ১১টায় ব্রক্ষপুত্র নদে টলারে উঠে মৎস সপ্তাহ উপলক্ষ্যে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন। কিশোরগঞ্জের মির্জাপুর উপজেলা এবং দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার টাঙ্গাবরের চরের অংশ এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পরে অনুষ্ঠানস্থলে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে উঠলে হাজার হাজার নেতা-কর্মী তাকে করতালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে কিশোরগঞ্জে পাকুন্দিয়া, কটিয়াদিসহ আশাপাশের জেলারর মধ্যে কাপাসিয়া ও গফরগাঁও উপজেলার বিএনপি নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উচ্ছাস দেখা যায়।
বিশৃঙ্খলাকারীদের সস্পর্কে সর্তক থাকুন
প্রধান মন্ত্রী বলেন, ‘কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রাস্তায় রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। রাজপথে যদি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ জনগণ। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের চাকরি বাকরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের জীবনযাপত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু উপকৃত হয় সেই সকল বিশৃঙ্খলাকারী।'
তিনি বলেন,‘আজকে শপথ গ্রহণ করি,সকলে প্রতিজ্ঞা করি যে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যারা কাজ করবে, যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে যারা জনগণের স্বার্থে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করবে তাদেরকে জনগণ জনগণের সকল শক্তি নিয়ে তাদেরকে প্রতিরোধ করবে। এখন দেশের মানুষ এখন দেশের শান্তি চায়, দেশের মানুষ এখন আইনের শাসন চায় দেশের মানুষ কর্মসংস্থান চায়, দেশের মানুষ তার সন্তানদের জন্য শিক্ষা চায়, দেশের মানুষ তার পরিবারের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চায়ৃ এই কাজগুলো যদি করতে হয় আমাদেরকে তাহলে ধৈর্য ধরতে হবে। একই সাথে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে তাদের ব্যাপারে।’
পাকুন্দিয়ার কর্মসূচি শেষ করে প্রধান মন্ত্রী কটিয়াদি কার্ড হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শনে যান। সেখান থেকে আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের মাঠে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং জাতীয় মৎস্যপদক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী জর্জ ইনস্টিটিউট মাঠে জাতীয় মৎস্য পক্ষের উদ্বোধন এবং বিকেলে কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলাদা দুটি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন।
প্রধান মন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি বাস্তবায়ন করলে দেশের মানুষ উপকৃত হবে। গ্রামের মানুষ উপকৃত হবে। খাল খনন কর্মসূচি শুরু করায় কৃষক ভাইয়েরা উপকার পাচ্ছেন। নদীতে পোনা মাছ ছাড়ায় খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে। নারীদের স্বাবলম্বী করতে অনার্স পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করলে তাদের উপবৃত্তির আওতায় আনা হবে। এক কোটি ২০ লাখ শিশুশিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও স্কুল ব্যাগ দেওয়া হবে। চার কোটি পরিবারের গৃহকর্ত্রীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা হবে’।
তিনি বলেন, ‘কৃষিপ্রধান দেশ এটি। আমরা কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে চাই। সে লক্ষ্যে কৃষি কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমৈ কৃষকদের হাতে বিনামূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক পৌঁছে দেওয়া হবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন খেলাধুলাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে পারে এবং শিল্পী তৈরি হয়- নতুন কুঁড়ির মাধ্যমে সেসব চর্চা শুরু করা হচ্ছে। মসজিদ-মন্দিরসহ সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ইমাম-মুয়াজ্জিন-পুরোহিত-যাজকসহ সংশ্লিষ্টদের স্বাবলম্বী করতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। সকলকে আর্দশ নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা হলে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। তাই বাংলাদেশকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিবর্তন করতে চাই’।
পতিত স্বৈরাচারের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘যারা মানুষের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পররাষ্ট্রনীতিকে ধ্বংস করেছিল, জোর করে ক্ষমতা দখল করেছিল, দেশের অর্থসম্পদ পাচার করেছিল - জনগণ রুখে দাঁড়িয়ে দেশ থেকে তাদের বিতাড়িত করেছে। তাদের দুর্নীতির কারণেই সারাদেশের মানুষ আজকে বিদ্যুৎ-জ্বালানির জন্য কষ্ট ভোগ করছে। এর জন্য দায়ী তারাই। এ সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। এদের রুখে দিতে হবে’।
দেশের মানুষকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে আগামী ২৭ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে দশ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
জলাশয় সংস্কার করে পোনা ছাড়বে সরকার দেশের বিভিন্ন এলাকায় পড়ে থাকা পুকুর, বিল, হাওরসহ জলাশয়গুলো সংস্কার করে সেখানে মাছের পোনা ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এসব জলাশয় সংশ্লিষ্ট এলাকার তরুণণদের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরো বলেন, ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের পুকুর, বিল, হাওর-বাঁওড় ও অন্যান্য জলাশয় কাজে লাগিয়ে অল্প জমিতেও মাছ চাষের মাধ্যমে মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক জলাশয় কোনো কাজে ব্যবহার না করে পড়ে রয়েছে। সরকার সেগুলো সংস্কার করে মাছের পোনা ছাড়তে চায়। যে এলাকার জলাশয় যে এলাকায় থাকবে, ওই এলাকার তরুণদের মধ্যে তা সুন্দরভাবে বণ্টন করা হবে। এর মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে’।
৫২ দেশে মৎস্যপণ্য রপ্তানি
প্রধান মন্ত্রী বলেন, ‘চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের প্রায় ৫২টি দেশে মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে’।
এই অর্জনের কৃতিত্ব উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, মৎস্যচাষি এবং এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেক মানুষের বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এশিয়ার দেশগুলো ক্রমেই মিঠাপানির মাছ উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। গত জুনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এফএও প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাছসহ জলজপ্রাণী উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। আর অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়’।
চিংড়ি উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে খুলনা অঞ্চলে ৩০০টি ক্লাস্টার গঠন প্রকরে ক্লাস্টারভিত্তিক চিংড়ি চাষ উন্নয়নের কথা তুলে ধরেন ধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এর ফলে ৬০ হাজার ৫০০টি ঘেরে উৎপাদন গড়ে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে’। এছাড়া কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলায় সাত হাজার একর জমিতে চিংড়ি চাষ উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নসহ একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইলিশ উৎপাদন ও সংরক্ষণেও সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইলিশ শুধু বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ও অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি দেশের জিআই পণ্য হিসেবেও বিশ্বে স্বীকৃত। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ, যা দেশজ জিডিপিতে এক শতাংশের বেশি অবদান রাখছে’।
মৎস্যখাতে নির্ভশীল প্রায় দুই কোটি মানুষ
প্রধান মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্যখাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই এ খাতকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখা সরকারের বিশেষ দায়িত্ব’। মৎস্য, পশুসম্পদ ও জলজখাতকে সরকার অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের বহু কোটি মানুষ এসব পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। মৎস্যচাষি ও জেলেদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
এরই অংশ হিসেবে মৎস্যচাষিদের কৃষক কার্ডের আওতায় আনা হচ্ছে এবং এরই মধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং একই সঙ্গে জেলেদের পরিচয়পত্র প্রদান ও নিবন্ধন কার্যক্রমও চলমান থাকার তথ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধকালীন জেলেদের ভিজিএফের আওতায় আনা হয়েছে’।
নতুন বাজার খুঁজতে উদ্যোক্তাদের আহ্বান
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত জুনে নাইজেরিয়ায় হ্যাচিং ডিম রপ্তানি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে নতুন নতুন পণ্যের বাজার খুঁজে বের করতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতা করবে’।
প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করেছে বলেও জানান তিনি। এই ফান্ড থেকে সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ বা শিল্প উদ্যোগের জন্য পাঁচ লাখ থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়ার কথা উল্লেখ করে নতুন উদ্যোক্তাদের এ সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
‘জলাশয় রক্ষায় সচেতন হোন’
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘টিস্যু পেপার, প্লাস্টিক বর্জ্য, পানির বোতলসহ নানা ধরনের আবর্জনার কারণে দেশের খাল-বিল, নদী-নালা ও হাওরের পরিবেশ ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। মাছ ও জলজ পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে সবাইকে পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হতে হবে’।
মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে এখাতে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৪জন উদ্যোক্তাকে স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। কটিয়াদীর আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের জলাশয়ে মৎস্য পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনসাধারণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও বক্তব্য প্রদান করেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় পাকুন্দিয়ার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের জলাশয়ে এ মৎস্য পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এসময় তিনি মৎস্য দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে পাকুন্দিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির মুনিয়ারিকান্দি ও গফরগাঁও দত্তেরবাজার সেতু প্রকল্প হাতে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, গফরগাঁও ও দক্ষিণ গফরগাঁও এর সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাচ্চু এবং কিশোরগঞ্জ-২সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিনসহ বসামরিক কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের উন্নয়নে ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাতে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান উন্নয়ন কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদল আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং উপস্থিত জনসাধারণের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।
এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের উন্নয়নে ১৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসকের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে ৬ কোটি টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দ্রুত মাঠের উন্নয়নকাজ শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ঈদে শোলাকিয়া ঈদগাহের ঐতিহাসিক দুইশ বছর পূর্তি হবে। এ উপলক্ষে মাঠটিকে আরও সুন্দর ও আধুনিকভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি ঈদে এই মাঠে লাখো মানুষ নামাজ আদায় করেন। মুসল্লিদের সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করতে মাঠের উন্নয়ন করা হবে। মাঠের গেট নির্মাণ, পুকুরে ওজুর ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও উন্নয়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই মাঠটিকে উন্নয়নের জন্য আমরা ১৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে ৬ কোটি টাকা সরকার থেকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দ্রুত এই কাজ হবে। এই মাঠটিকে সুন্দর করা হবে, যাতে মুসল্লিরা এখানে স্বাচ্ছন্দ্যে নামাজ পড়তে পারেন, এলাকার ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলাধুলা করতে পারে। এখানে সুন্দর গেট করা হবে এবং মাঠের পুকুরে ওজুর ব্যবস্থা করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর আগমন, ধানের সাজে নজর কাড়লেন দুই বিএনপি কর্মী
জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ সফর ঘিরে জেলাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁকে একনজর দেখতে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ শহরের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হন। এর মধ্যে ধানের শীষ ও ধানের গোছা দিয়ে ব্যতিক্রমী সাজে দুই বিএনপি কর্মী সবার নজর কাড়েন।
রবিবার সকাল থেকেই কিশোরগঞ্জ জেলা শহর ও আশপাশের এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। হাতে জাতীয় পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।
এরই মধ্যে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ফেরদৌস মিয়া মাথা থেকে শরীরের প্রায় পুরোটা ধানের শীষ ও খড় দিয়ে মুড়িয়ে সড়কে হাজির হন। সবুজ পোশাকের ওপর ধান দিয়ে তৈরি বিশেষ পোশাক এবং মাথায় ধানের তৈরি বড় আকৃতির টুপি পরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায় অবস্থান নেন। তাঁর ব্যতিক্রমী সাজ দেখতে পথচারী ও উৎসুক মানুষ ভিড় করেন এবং মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।
ফেরদৌস মিয়া বলেন, দলের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের কৃষকের ঐতিহ্য তুলে ধরতেই তিনি ধান দিয়ে এভাবে সেজেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করাই তাঁর মূল প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, “আমি দলকে ভালোবাসি। তারেক রহমানকে ভালোবাসি। সবাইকে ভালোবেসেই দল করি। আজ তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করাই আমার আসল চাওয়া। তাঁর কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই। তিনি কী দেবেন, কী লাভ হবে—এসব আমার কাছে বিষয় নয়। তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করতে পারাটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
নিজের জীবিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি কাজকর্ম করে দিন আনি, দিন খাই। দল করি নিজের কামাই দিয়ে। আমার কোনো ধান্দাবাজি নেই।”
দেশের চলমান বিভিন্ন সমস্যা প্রসঙ্গে ফেরদৌস মিয়া বলেন, ধানের দাম, গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমস্যা দেখা দেয়। সরকারকে যারা সমস্যায় ফেলতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে, হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা বিএনপি কর্মী মোহাম্মদ রফিক মিয়াও ধানের গোছা ও শীষ দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আশায় জেলা শহরের জেলখানা মোড়ে আসেন।
শরীর ও গলায় পাকা ধানের গোছা ও শীষ দিয়ে তৈরি পোশাক পরে রফিক মিয়াকে দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়ান। পরে তাঁকে ঘিরে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যায়। অনেকে মোবাইল ফোনে তাঁর ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।
রফিক মিয়া বলেন, “আমি আমার দলকে অনেক ভালোবাসি। দলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আজ ধান দিয়ে নিজেকে সাজিয়েছি। ধান আমাদের ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করেই আজকের এই সাজে এসেছি।”
তিনি বলেন, “আজ আমাদের নেতা তারেক রহমান কিশোরগঞ্জে আসছেন। প্রিয় নেতার সঙ্গে দেখা করার অনেক আশা নিয়ে আমি কিশোরগঞ্জে এসেছি। আমার একটাই প্রত্যাশা, আমি যেন আমার নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারি এবং তাঁর সঙ্গে হাত মেলাতে পারি।”
রফিক মিয়া আরও বলেন, ধান শুধু কৃষকের জীবিকা নয়, গ্রামবাংলার মানুষের জীবন ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ধানের শীষ দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে নিজের অনুভূতির পাশাপাশি দেশের কৃষি ও গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।
এদিকে, রোববার দুপুর ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রী পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যানবাড়িঘাট এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান। পরে তিনি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত ও স্থানীয় জেলেদের মধ্যে মাছের পোনা বিতরণ করেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে আয়োজিত জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানে মৎস্য খাতে বিশেষ অবদানের জন্য নির্বাচিত ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে জাতীয় মৎস্য পদক তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক, মোড় ও অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশে দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ব্যানার, ফেস্টুন ও স্লোগান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায় অবস্থান নেন।
পরে জেলা শহরের পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে অনুদান প্রদান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানি প্রদানের কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়। সবশেষে তিনি পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফর ঘিরে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ দেখা যায়। বিশেষ করে ধানের শীষ ও ধানের গোছা দিয়ে সাজা দুই বিএনপি কর্মীর ব্যতিক্রমী উপস্থিতি দিনভর স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি করে।