আয়াশ ও রিমির শুনানিতে হট্টগোল-মারামারি, এজলাস ছাড়লেন বিচারক
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় 'রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম'-এর আল নূর মোহাম্মদ আয়াশ (২৭) এবং মার্জিয়া খন্দকার রিমির (২৬)- জামিন শুনানিতে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিয়াদ হাসান এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় অবস্থান নেন।
গত ১১ অক্টোবর রিমি ও সুজনের দুই দিন এবং আয়াশ ও সাকিবুল হাসানকে এই মামলায় তিন দিনের রিমান্ড দেন আদালত।
আসামি আয়াশ ও মার্জিয়ার রিমান্ড শেষে বুধবার তাদেরকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক আব্দুল গাফফার হিমেল।
আবেদনে বলা হয়, আসামিরা রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন এবং সেগুলো যাচাই-বাছাই এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।
এদিন বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানা থেকে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা মধ্যে দিয়ে তাদের এজলাসে ওঠানো হয়। লিফট ব্যবহার না করে তাদের সিঁড়ি দিয়ে সিএমএম আদালতের ৯ তলায় নেওয়া হয়। এরপর তাদের এজলাসে রাখা হয়। কিছুক্ষণ পরে বিচারক এজলাসে ওঠেন।
আসামিদের পক্ষের আইনজীবী মনির হোসেন সুমন জামিন চেয়ে শুনানি করেন।
তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে মামলা। তাদের বিরুদ্ধে তিন ধারার অভিযোগ এনে মামলা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে কেউ ভালবাসে, আবার অনেকে বিদ্বেষ করে। তিনি আসমান থেকে আসেননি, কোনো দেবদূতও না।
তিনি আরও বলেন, আয়াস অসুস্থ। তাদের জামিনের প্রার্থনা করছি। যে কোনো শর্তে তাদের জামিন চাচ্ছি। তারা জুলাই যোদ্ধা।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধী করে বলেন, আয়াস পাকিস্তান ও জিন্নাহ'র কবর জিয়ারত নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। পাকিস্তান ও জিন্নাহকে নিয়ে বক্তব্য রাখার পেছনে দুরভিসন্ধি আছে। বাপ-মা, দাদা-দাদী কবরের খোঁজ-খবর নেন না, অথচ পাকিস্তানে গিয়ে জিন্নাহর কবর জিয়ারতের কথা বলে।
তিনি বলেন, জিন্নাহকে নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। পাকিস্তান-ভারতকে সামনে এনে তারা বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়।
এই আইনজীবী বলেন, সেগুনবাগিচা থেকে হকার উঠিয়ে কেন গ্রাফিতি আঁকা হলো, এটা নিয়ে তাদের জ্বালা। আপনারা গোলাম আযম, নিজামীর ছবি রাখার কথা বলতে পারেন, কিন্তু অন্য জনের ছবিতে কালি দিতে পারেন না। হিন্দু সম্প্রদায়কে উস্কানী দিতে তারা এমন কর্মকাণ্ড করেছে।
তিনি বলেন, গত ৭ মাস ধরে এই সরকার ও জনগণকে তারা গালিগালাজ করছে। এই জেনারেশনকে খারাপ করছে তারা। সেফুদা নামে একজন আছে, যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে গালিগালাজ করে। তাকে দেখে তারা গালিগালাজ শিখেছে। আর তারা গালিগালাজ শেখাচ্ছে এই জেনারেশনকে। তারা একটা জেনারেশনকে নষ্ট করছে।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান-ভারতকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশে টেনে এনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করছে তারা।
আয়াস-রিমির আইনজীবীদের উদ্দেশে ওমর ফারুক বলেন, এরা সবাই জামায়াতের আইনজীবী, দেখলেই বোঝা যাচ্ছে!
এসময় আসামিপক্ষের আল মহসিন তৌহিদ নামের এক আইনজীবী এর বিরোধীতা করে বলেন, 'পিপির বক্তব্যে আপত্তি আছে।'
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মুহুর্তের মধ্যে এজলাসে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
বিচারক এজলাসে থাকা অবস্থায় তারা এসে ওই আইনজীবীকে কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন। এক আইনজীবীর পরিহিত শার্ট টেনে ছিঁড়ে ফেলেন তারা। এসময় কয়েকজন বলতে থাকেন, তিনি (আল মহসিন তৌহিদ) অসুস্থ। কয়েকজন গিয়ে তাকে ছিনিয়ে আনেন। এ অবস্থা দেখে ৩ টা ৩৬ মিনিটের দিকে এজলাস ছেড়ে নেমে যান বিচারক রিয়াদ হাসান। আদালতে চিল্লাচিল্লি ও হট্টগোল চলতে থাকে।
বেশ কয়েক মিনিট ধরে প্রসিকিউটর ফারুকী এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসেন সুমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন।
এ অবস্থায় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আয়াস প্রসিকিউটর ওমর ফারুকের উদ্দেশে বলেন, 'ক্ষমা চেয়েছি, স্যার। ক্ষমা চাই, আমি ক্ষমা চাই প্লিজ।'
আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'এসব (মারামারি) করে আমার জীবন ধ্বংস করবেন।'
আল মহসিন তৌহিদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, 'আপনাকে তো আমি চিনি না। আপনি কেন আসছেন?'
এসময় আরেক আইনজীবী আয়াসকে ধমক দিয়ে বলেন, 'আপনাকে চিনতে হবে না '
পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর ৩ টা ৪২ মিনিটের দিকে বিচারক রিয়াদ হাসান পুনরায় এজলাসে ওঠেন। কিছুক্ষণ পরে আসামিদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
আবারও কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাদের আদালত থেকে কারাগারে নেওয়া হয়।
কারাগারে নেওয়ার পথে আসামি আয়াস বলেন, 'আমি কি মার্ডার করে আসছি। আমাকে এভাবে নেওয়া হচ্ছে।'
এর আগে, গত ১৩ অক্টোবর একই মামলায় গ্রেপ্তার সাকিব ও সুজন নামে দুই আসামিকে রিমান্ড শেষে কারাগার পাঠানো হয়।
জানা গেছে, গত ১০ অক্টোবর দুপুরে শিল্পকলা একাডেমির সামনে দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি মুছতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন আয়াসসহ একদল তরুণ। এর জেরে উভয়পক্ষের বাকবিতণ্ডার মধ্যে আয়াসসহ চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
ঘটনাস্থলে এক নারীকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দিতে দেখা যায়, তখন এক পুলিশ সদস্য তাকে বাধা দেন।
এ সময় ওই নারী বলেন, তারা 'ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ' জানাতে এসেছেন।
পুলিশি বাধার মুখে আয়াসের নেতৃত্বে তারা স্লোগানও দেন।
তার আগে, গত ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরপর ফুটপাতের পাশের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়।
'জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স'- নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত শুক্রবার এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের ছবি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সত্যজিৎ রায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে 'পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব' আখ্যা দিয়ে তাদের প্রতিকৃতি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তারা।
শনিবার 'রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম'- এর আয়াসের নেতৃত্বে সেসব প্রতিকৃতি মুছতে যায় একদল লোক।