মূল সংবাদে যান
২৪ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার করুন

রাশিয়ার ভ্যাকসিন প্রত্যাখ্যান করল যুক্তরাষ্ট্র

ডেস্ক রিপোর্ট ৬৯ বার পঠিত ৭ মিনিটের পাঠ

যুক্তরাষ্ট্র আগেই জানিয়েছিল তারা রাশিয়ার তৈরি ভ্যাকসিন নেবে না। মস্কোর ভ্যাকসিন তৈরির স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে ওয়াশিংটন। 

মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে করোনা ভ্যাকসিন তৈরির ঘোষণা দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বেশ কয়েকটি দেশ তাদের এ ভ্যাকসিন পেতে চাচ্ছে বলেও জানানো হয়। কিন্তু নিজেদের পূর্বের অবস্থানে অটল যুক্তরাষ্ট্র।

শুক্রবার মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে রুশ কর্মকর্তারা জানান, করোনায় জর্জরিত যুক্তরাষ্ট্রকে চিকিৎসাক্ষেত্রে যুগান্তকারী সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে পুতিন প্রশাসন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি জানিয়ে দেয় মস্কোর তৈরি চিকিৎসা সহযোগিতা নিতে এ মুহূর্তে প্রস্তুত নয় ওয়াশিংটন।

সিএনএনকে রাশিয়ার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, স্বাভাবিকভাবে রাশিয়া বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটা অবিশ্বাস রয়েছে। এ অবিশ্বাসের কারণে ভ্যাকসিন তৈরির প্রযুক্তি, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং করোনা চিকিৎসা সহায়তা গ্রহণ করেনি ওয়াশিংটন।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কেলি ম্যাকেনানি জানান, রাশিয়ার নতুন ভ্যাকসিনের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছে। আমাদের ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা যথাযথভাবে চলছে। যা উচ্চমান সম্পন্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের গণস্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রাশিয়ার ভ্যাকসিন অর্ধেক রান্না করা খাবারের মতো। ওয়াশিংটনের এতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। এ ভ্যাকসিন নেয়ার প্রশ্নই উঠে না। মানুষ কেন বানরের দেহেও রাশিয়ার তৈরি ভ্যাকসিন প্রয়োগ করবো না আমরা।

মঙ্গলবার রাশিয়া জানায়, করোনা মোকাবিলায় তারা একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, তার নিজের মেয়ের শরীরে সেই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে।

কিন্তু ভ্যাকসিন তৈরির পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়ায় পুতিনের দাবি নিয়ে সন্দেহ করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

কার্যকর একটি ভ্যাকসিন তৈরির জন্য মরিয়া সারাবিশ্ব। বর্তমানে অন্তত ২০টি ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে। মহামারীর মধ্যে একটি ভ্যাকসিন শত কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় সহায়তা করতে পারে। শুধু জীবন রক্ষা নয়, ভ্যাকসিন উদ্ভাবন এবং তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানও আয় করবে হাজার হাজার কোটি ডলার।

‘রুশ ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী মার্কিন কিছু প্রতিষ্ঠান’

রুশ কর্তকর্তারা জানিয়েছেন, ভ্যাকসিন তৈরির তথ্য আদান-প্রদানে মস্কো প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে রুশ ভ্যাকসিন তৈরির অনুমতিও দেবে তারা। এর আগে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএন জানায়, মস্কোর ভ্যাকসিনের বিষয়ে তথ্য পেতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ফার্মাসিউটিকেলস কোম্পানি। তবে সে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম জানানো হয়নি।

অপ্রত্যাশিতভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর রুশ কর্মকর্তারা জানান, ওয়াশিংটনের উচিৎ ভ্যাকসিন গ্রহণের বিষয়টি ভালোভাবে বিবেচনা করা। রাশিয়ার তৈরি করোনা ভ্যাকসিন স্পুটনিক-ভি মার্কিনদের জীবন রক্ষায় সহায়তা করতে পারে বলেও মত তাদের।

‘আমাদের ভ্যাকসিন সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত। কেনো যুক্তরাষ্ট্র এটি গ্রহণ করার বিষয়ে গভীরভাবে ভাবছে না? কেনো ভ্যাকসিনের পথে রাজনৈতিক বাধা তৈরি করলো? প্রশ্ন রাখেন জ্যেষ্ঠ এক রুশ কর্মকর্তা।

মঙ্গলবার রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানায়, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার অন্তত ২০ দেশ ভ্যাকসিন নেয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে বলেছেন, রুশ ভ্যাকসিনের উপর তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। ফিলিপিন্সে ভ্যাকসিন পৌঁছালে তিনি নিজে সেটি গ্রহণ করবেন বলেও জানান।

মেক্সিকোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৃহস্পতিবার বলেছেন, রুশ ভ্যাকিসন নেয়ার বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

‘ভ্যাকসিন পরীক্ষার তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ হয়নি’

মস্কো ভিত্তিক গ্যামেলিয়া ইনস্টিটিউট ভ্যাকসিনটি তৈরি করেছে। ভ্যাকসিন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয়ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রুশ সরকার এটি অনুমোদন দেয়। তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে হাজার হাজার মানুষের দেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করে তার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হন। রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের প্রধান কিরিল দেমিত্রিবের ঘোষণা অনুযায়ী গেলো বুধবার থেকে রাশিয়ায় ভ্যাকসিনটির তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরু হওয়ার কথা।

ভ্যাকসিন পরীক্ষার কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করেনি রাশিয়া। ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা বা কার্যকরিতা সম্পর্কেও সিএনএন নিশ্চিত হতে পারেনি বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়ার নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ভ্যাকসিনের গুণাগুন সম্পর্কিত কোনো তথ্য মার্কিন সরকারের কাছে নেই। 

তিনি বলেন, ‘রাশিয়ায় করোনা আক্রান্ত অনেক রোগী রয়েছে। তারা চাইলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে পারতো। কিন্তু ব্যাপক আকারে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে আরো বলেন, রাশিয়ার ভ্যাকসিনের কোনো ট্রায়াল হয়নি। মানব দেহে ভ্যাকসিনটি কেমন কাজ করে সে বিষয়টি জানার জন্য তারা খুব কম কাজ করেছে। আমাদের কাছে রুশ ভ্যাকসিনের নিরাপত্তার বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

এপ্রিলে রাশিয়া একটি নিয়ম করে। যেখানে অনুমোদনের আগে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়। যা অতিদ্রুত ভ্যাকসিন তৈরিতে রুশ গবেষকদের সুযোগ করে দেয়।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, মহামারীর মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তেতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিষয়েটি বিবেচনা করা যায়। জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্নের উত্তর উপেক্ষা করা হয়। রাশিয়া এ কাজটিই করেছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে পরিপূর্ণ ভ্যাকসিন এটি নয়। তাদের ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়া এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে সন্দিহান। কারণ ঝুঁকির বিষয়গুলো আমরা জানি না।’

অক্টোবরে গণহারে রাশিয়ায় ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হবে। তার আগে করোনায় আক্রান্ত ঝুকিপূর্ণ ব্যক্তিদের শরীরে এটি প্রয়োগ করবে মস্কো।

‘সুযোগ নেয়ার জন্য ভ্যাকসিন তৈরি করেছে রাশিয়া’

মার্কিন প্রশাসনের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়ার ভ্যাকসিন তৈরি একটি হাস্যকর কৌতুক ছাড়া কিছুই না। কারণ তারা ভ্যাকসিন তৈরির তিনটি ধাপ সম্পূর্ণ করেনি। একটি ধাপও তারা শেষ করেনি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বা যুক্তরাষ্ট্র রুশ ভ্যাকসিন নিয়ে গুরুত্ব সহকারে কথাও বলছে না। আমার কাছে মনে হচ্ছে ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিযোগিতায় চীন অনেক এগিয়ে রয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, শুধুমাত্র সুযোগ নেয়ার জন্য রাশিয়া এভাবে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। কারণ করোনা মোকাবিলায় ট্রাম্প যথেষ্ট পরিমাণে চাপে রয়েছেন। সামনের নির্বাচনে ট্রাম্পের করোনা মোকাবিলার দক্ষতাও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে। এ সুযোগটি কাজে লাগাতে চেয়েছেন পুতিন। পুতিনের কাছে ভ্যাকসিনের মান নিয়ে প্রশ্ন করার মতো কেউ নেই। আর রাশিয়ার ভ্যাকসিন তৈরির আদর্শমান এবং কার্যকারিতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও নয়।