মূল সংবাদে যান
২৩ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার করুন

মিশরে মিলাদুন্নবী: মিষ্টির পুতুলে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের ছোঁয়া

আফছারুল হোসাইন ১৫ বার পঠিত
মিশরে মিলাদুন্নবী: মিষ্টির পুতুলে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের ছোঁয়া

নীলনদ, পিরামিড ও হাজারো মিনারের দেশ মিশরে আগামী ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার পালিত হবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। তবে দেশটির সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, এ উপলক্ষে সরকারি ও সাধারণ ছুটি থাকবে ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার পর মিশরে অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে পালিত হয় ঈদে মিলাদুন্নবী। মিশরীয়রা দিনটিকে সাধারণত ‘মাওলিদ আল-নাবি’ বা ‘মাওলিদ আল-রাসুল’ (সা.) নামে অভিহিত করেন।

*মিষ্টির উৎসবে মেতে ওঠেছে মিশর- প্রতি বছর রবিউল আওয়াল মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কায়রোসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের সুপারশপ, বাজার, পাড়া-মহল্লার মিষ্টি ও বেকারীর দোকান গুলোতে বসে ‘হালাওয়েত আল-মাওলিদ’-এর পসরা। বাদাম, তিল, চিনি ও ঘন সিরাসহ বিভিন্ন উপকরণে তৈরি এসব মিষ্টির মধ্যে ‘মালবান’ অন্যতম জনপ্রিয়। সরেজমিনে বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ‘হালাওয়াত আল-মাওলিদ’ বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ২০০ মিশরীয় পাউন্ডে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকার সমান।

মিশরের প্রাচীন রাজধানী ফুসতাত এ অবস্থিত সাইয়েদা জয়নব এলাকার দোকানি 'হিসাম মাহমুদ' বলেন, এ বছর বেচা-কেনা ভালো না। মানুষের হাতে পয়সা নেই। গতবছর যেখানে একজন ক্রেতা ৪/পাঁচ কেজি মিষ্টি কিনত এবার তারা ১ বা ২ কেজি কিনে নিচ্ছে।‌

তবে মিশরের মিলাদুন্নবীর উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও পরিচিত ঐতিহ্য হলো ‘আরুসাত আল-মাওলিদ’—অর্থাৎ ‘মাওলিদের পুতুল’। চিনি দিয়ে তৈরি এই পুতুলকে সাধারণত কনের সাজে সাজানো হয়। সাদা ও রঙিন কাপড়, কাগজ ও নানা ধরনের অলংকার দিয়ে তৈরি করা হয় এর পোশাক ও সাজসজ্জা। শিশুদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় এই মিষ্টির পুতুল মিশরের লোকসংস্কৃতি ও উৎসবের ঐতিহ্যের একটি পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাজার ও দোকানে নানা রঙ, নকশা ও আকারের ‘আরুসাত আল-মাওলিদ’ দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে এর নকশা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন এলেও মিশরীয়দের কাছে এর আবেদন এখনো অমলিন। মিশরের পথঘাট, বাজার ও উৎসবের সাজে ‘আরুসাত আল-মাওলিদ নামের এই পুতুল যেন ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও আনন্দের এক অনন্য মেলবন্ধন। প্রকারভেদে প্রতিটি আরুসাত আল-মাওলিদ বিক্রি হচ্ছে ২শ থেকে হাজার পাউন্ডে।‌

ঐতিহাসিকদের মতে, মিশরে আনুষ্ঠানিক ভাবে মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রচলন শুরু হয় ফাতিমীয় খেলাফতের সময়। দশম থেকে দ্বাদশ শতকের এ সময়ে শাসকগোষ্ঠী মাওলিদ উপলক্ষে দরিদ্র ও অভাবী মানুষের জন্য ভোজের আয়োজন করত এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি বিতরণ করত বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

‘আরুসাত আল-মাওলিদ’-এর উৎপত্তি নিয়েও মিশরে একটি প্রচলিত লোককাহিনি রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ফাতিমীয় শাসনামলের খলিফা আল-হাকিম তাঁর এক স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মাওলিদের দিনে শহরে বের হয়েছিলেন। তিনি রাজকীয় পোশাকে জনসম্মুখে উপস্থিত হলে তাঁর সঙ্গে থাকা নারীর সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এক মিষ্টি কারিগর কনের আকৃতিতে একটি মিষ্টির পুতুল তৈরি করেন। পরবর্তীকালে সেটিই ‘আরুসাত আল-মাওলিদ’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বলে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। তবে মিশরীয়দের অধিকাংশই এই পুতুলকে ধর্মীয় কোনো অনুষঙ্গ হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক নিদর্শন হিসেবেই দেখেন।

*মসজিদে দোয়া ও সুফি ঐতিহ্য- মিশর শাফেয়ি মাজহাবের ঐতিহ্যবাহী প্রভাব থাকা একটি দেশ হলেও দেশটির ধর্মীয় চর্চায় বিভিন্ন মাজহাব ও সুফি ধারার প্রভাব রয়েছে। ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে কায়রোর বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া, কোরআন তেলাওয়াত ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে কায়রোর ঐতিহাসিক ইমাম হোসাইন (রা.) মসজিদকে ঘিরে এদিন ভক্তদের উপস্থিতি বাড়ে। মাগরিবের নামাজের পর দোয়া ও দরুদ পাঠের পাশাপাশি মসজিদের আশপাশে সুফি অনুসারীদের ধপ বাজিয়ে ইসলামী সংগীত ও ধর্মীয় সঙ্গীত পরিবেশন করতেও দেখা যায়।

*মিষ্টি বিতরণে উৎসবের আমেজ ঈদে মিলাদুন্নবীর দুই-তিন দিন আগে থেকেই পুরো মিশরে শুরু হয় মিষ্টি বিতরণের উৎসব। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ‘হালাওয়েত আল-মাওলিদ’ বিতরণ করা হয়। তাছাড়াও পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যেও মিষ্টি উপহার দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। ফলে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এ সময়টি পরিণত হয় সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের এক আনন্দঘন উৎসবে।

*রোজা, কোরআন তেলাওয়াত ও ঘরোয়া আয়োজন- ১২ রবিউল আওয়াল বা মিলাদুন্নবীর দিনে অনেক মিশরীয় নফল রোজা রাখেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত সময় কোরআন তেলাওয়াত, নফল ইবাদত ও দরুদ পাঠে কাটান। তবে বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলের মতো মসজিদে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মিলাদ কায়েম’-এর প্রচলন মিশরে সাধারণভাবে দেখা যায় না। বরং ব্যক্তিগত ইবাদত, দোয়া ও ধর্মীয় আলোচনাই এদিনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।

সন্ধ্যার পর অনেক মিশরীয় পরিবারে দেখা যায় বিশেষ খাবার তৈরির আয়োজন। এর মধ্যে ‘রুজ বি লাবান’—দুধ ও চাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের মিষ্টি পায়েস—ছোট ছোট পাত্রে করে প্রতিবেশী ও পথচারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। সব মিলিয়ে মিশরে ঈদে মিলাদুন্নবী শুধু একটি ধর্মীয় উপলক্ষ নয়; বরং শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। আর সেই ঐতিহ্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলোর একটি হয়ে আজও টিকে আছে রঙিন সাজে সজ্জিত 'আরুসাত আল-মাওলিদ'।